একাকীত্বের সঙ্গী
from লোকমানুষ এর ব্লগ

টেলিপোর্টার আবিষ্কারের পর পৃথিবী থেকে সবার আগে হারিয়ে গিয়েছিল ‘দূরত্ব’ নামক ধারণাটি। কোথাও পৌঁছানোর ব্যাপারে মানুষ মুক্ত হয়েছিল অপেক্ষার হাত থেকে। প্রথম দফায় যন্ত্রগুলো বসানো হয়েছিল এমন সব স্থানে যেগুলো ছিলো মানুষের চিরচেনা গন্তব্য। ব্যস্ত শহরের কেন্দ্র, কোলাহলপূর্ণ বিমানবন্দর, ঝলমলে সমুদ্রসৈকত আর পাহাড়ি রিসোর্টের চূড়ায়। এক প্যাডে দাঁড়িয়ে চোখের পলকে মানুষ পৌঁছে যাচ্ছিল পৃথিবীর আরেক প্রান্তে।
দ্বিতীয় দফায় টেলিপোর্টার গুলো হয়ে উঠে আরও উন্নত, আরও দ্রুত এবং আরও সহজ। টেলিপোর্টার গুলো মানুষের নাগালের বাইরে থাকা দুর্গম সব জায়গার দরজা খুলে দিল। বরফের তলদেশের গবেষণাকেন্দ্র, মেঘছোঁয়া পর্বতচূড়া, সমুদ্রের গভীর পর্যবেক্ষণ কক্ষ, জনমানবহীন প্রবালদ্বীপ। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষ এক করুণ সত্য আবিষ্কার করল। সত্যটি হলো- দূরে চলে যাওয়া আর সত্যিকার অর্থে একা থাকা এক জিনিস নয়। পৃথিবীর যত সুন্দর জায়গা আছে, তার প্রতিটি কোনায় শেষ পর্যন্ত মানুষের পায়ের ছাপ পড়তে লাগলো, আর মানুষ পৌঁছানোর সাথে সাথেই সেখানে ভিড় জমে উঠলো, শব্দ গুলো ধীরে ধীরে পরিণত হলো কোলাহলে, ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে হারাতে থাকলো মানুষের একাকিত্ব।
বেশ অনেক পরে আগমন ঘটলো তৃতীয় প্রজন্মের টেলিপোর্টারের। তবে এবারের টেলিপোর্টেশনের ধারণা বেশ অনেকটাই বদলে গেলো। ততদিনে মানুষ বুঝে গিয়েছিলো একান্তে সময় কাটানোর মর্ম। তাই টেলিপোর্টার গুলোও তৈরি হয়েছিল সেই ধারণাকে ভিত্তি করে। এবার আর গন্তব্য গুলো নির্দিষ্ট ছিলো না। ছিলো না কোন নাম, কোনো ছবি ছিল না, কোনো পরিচিতিও ছিল না। যাত্রীরা কেবল বেছে নেয়ার সুযোগ পেতো তাদের পছন্দ মতো সময়। আর টেলিপোর্টার কোম্পানি কেবল একটা নিশ্চয়তা দিত- নির্ধারিত সময়ে সেই স্থানে পৃথিবীর আর কোনো জীবিত মানুষ উপস্থিত থাকবে না। বিজ্ঞাপনের একদম নিচে সূক্ষ্ম অক্ষরে লেখা থাকত, “কিছু নীরবতা শুধু একজনের জন্যই তৈরি হয়।”
পাঁচ বছর আগে তার স্ত্রী মেঘলাকে হারানোর পর থেকে রাইয়্যানের কাছে সন্ধ্যার সময়টা এক অদ্ভুত যন্ত্রণার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দিনের বেলায় সে আর দশ জনের মতোই একদম স্বাভাবিক একজন মানুষ। অফিসের কাজ সারে, সহকর্মীদের সাথে হাসে, বাজার করে, প্রয়োজনে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তর্কও করে। কিন্তু সন্ধ্যা নেমে এলেই বাড়ির দরজা পেরিয়ে এক ধরনের বিস্তৃত শূন্যতা তাকে গিলে ফেলে, মনে হয় দিনের ঐ মানুষটি দরজার বাইরেই আটকে আছে।
শুরুতে সে মেঘলাকে খুব স্পষ্টভাবে মনে করতে পারত, তার কথা বলার ভঙ্গি, ঘুমানোর আগে বই পড়ার অভ্যাস, রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে অন্যমনস্কভাবে গান গাওয়ার সুর …..সবকিছু। কিন্তু বছর গড়াতে থাকতেই স্মৃতিগুলো অদ্ভুতভাবে বিকৃত হতে লাগল, মেঘলার মুখ মনে করতে গেলে কখনো তাকে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ দেখাত, আবার কখনো মনে হতো মুখটা ঘন কুয়াশায় ঢেকে ঝাপসা হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ভয় পেত সে এই দ্বিতীয় অনুভূতিটাকে, মেঘলাকে হারানোর চেয়েও তাকে ভুলে যাওয়ার আশঙ্কাটা তাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত।
তৃতীয় প্রজন্মের টেলিপোর্টারের ঐ অদ্ভুত বিজ্ঞাপনটি রাইয়্যান প্রথম দেখেছিল এমনই এক সন্ধ্যায়; ঠিক সেই সময় যখন ঘরের নিস্তব্ধতা তাকে চারপাশ থেকে চেপে ধরছিল। বিজ্ঞাপনটা পড়ার পর তার মনে হয়েছিল, হয়ত তিন দিনের জন্য পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সে অন্তত নিজের স্মৃতিগুলোর সাথে নিরিবিলিতে সময় কাটানোর একটা সুযোগ হবে। সেখানে কেউ তাকে সান্ত্বনা দেবে না, কেউ বলবে না যে- আহা! পাঁচটা বছর কেটে গেছে, এবার তোমার সামনে তাকানো উচিত।
সিদ্ধান্তটা সে খুব দ্রুতই নিয়েছিল, যেন দীর্ঘদিনের জমানো একটা সিদ্ধান্ত অবশেষে বাস্তব রূপ পেতে চলেছে। যদিও এবারের টেলিপোর্টেশনের টিকিটের দাম ছিলো তার নাগালের বাইরে। তবুও সে সিদ্ধান্ত নিলো সে এটা করবেই। সেই সিদ্ধান্তেই আট মাসের ইউনিট জমা করে যখন টিকিটটি কিনলো তখন তাকে বেশ দীর্ঘ কয়েকটা ফরম পূরণ করতে হয়েছিল। তার নিজের সম্পর্কে বেশ খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে জানাতে হয়েছিল টেলিপোর্টেশন কোম্পানিকে। তার ঠিক দু’দিন পর তার যাত্রার দিন নির্ধারিত হলো।
যাত্রার দিন টার্মিনালে দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছিল, সে কোনো ভ্রমণে যাচ্ছে না, বরং এমন এক সিদ্ধান্তের গভীরে ঢুকে পড়ছে- যার শেষটা সে নিজেও জানে না। টার্মিনালটি ছিল আশ্চর্যরকম নীরব, বিশাল সাদা ঘরের মাঝখানে গোলাকার প্যাডটি ছাড়া আর কিছু নেই, দেয়ালজুড়ে কোনো বিজ্ঞাপন নেই, কোনো কর্মচারী নেই, শুধু মেঝের নিচে নীল আলো ধীরে ধীরে জ্বলছে আর নিভছে।
রাইয়্যান প্যাডের ওপর দাঁড়াতেই একটি যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে এল- — “আপনি কি নিশ্চিত?”
প্রশ্নটা শুনে সে সামান্য হাসল, জিজ্ঞেস করলো- “কীসের ব্যাপারে?”
কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর এল না, তারপর কণ্ঠটি আবার বলল- — “আপনি কি একাই যেতে চান?”
রাইয়্যানের হাসিটা মিলিয়ে গেল, সে বলল- “হ্যাঁ।”
আলো জ্বলে উঠল, আর পৃথিবী সরে গেল। চোখ খুলে প্রথম যে অনুভূতিটা হলো, সেটা ছিল বাতাসের; বাতাসে লবণের গন্ধ, তার সাথে ভেজা কাঠের একটা মৃদু গন্ধ মিশে আছে। সামনে সমুদ্র, দূরে জলরাশি আকাশের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে মাঝখানে কোনো দিগন্তরেখা নেই, যেন পৃথিবীটা ওই পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। রাইয়্যান টেলিপোর্টেশন প্যাড থেকে নেমে ধীরে ধীরে বালির ওপর হাঁটল, পায়ের নিচে নরম বালি দেবে যাচ্ছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কোনো শব্দ হচ্ছিল না, সে থেমে নিজের পায়ের ছাপের দিকে তাকাল, এরপর পর আবার হাঁটা শুরু করলো।
সামনে একটি ছোট বাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, কাঠের তৈরি, নিচু ছাদ, সামনে বারান্দা। বাড়িটাকে দেখে রাইয়্যানের মনে হলো, সে যেন আগে কোথাও এই বাড়িটা দেখেছে, হয়ত কোনো ছবিতে, হয়ত কোনো স্বপ্নে, নয়তো এমন কোনো কল্পনায় যেটা সে কখনো নিজেকেই ঠিকমতো বলতে পারেনি। ভেতরে ঢুকে সেই অনুভূতিটা আরও তীব্র হলো, সবকিছু অপরিচিত, অথচ খুব অদ্ভুত রকমের পরিচিত। টেবিলের উপর রাখা কফির জারটি ঠিক সেই ব্র্যান্ডের যা সে বাড়িতে ব্যবহার করে; বইয়ের তাকের তৃতীয় সারিতে তার প্রিয় লেখকের সেই বইটি, যেটার শেষ কয়েক পাতা সে কোনোদিন পড়েনি; জানালার পাশে একটি কাঠের চেয়ার, যেটাতে বসে মেঘলা প্রতিদিন বিকেলে চা খেত।
রাইয়্যান প্রথমে এসবকে প্রযুক্তির পরিশীলিত সৌজন্য বলেই ভেবেছিল, বুকিংয়ের আগে কোম্পানি তার জীবনযাত্রা সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেছে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রান্নাঘরের তাকের ওপর রাখা নীল কাপটি দেখে তার সেই ব্যাখ্যাটা আর যথেষ্ট মনে হলো না। নীল রঙের কাপটির কিনারে সূক্ষ্ম একটি ফাটল, হুবহু সেখানেই যেটা মেঘলার কাপেও ছিলো।
এক সকালে কাপটি হাতে নিয়ে মেঘলা বলেছিল, “দেখেছ? এখনও টিকে আছে।” রাইয়্যান তখন বলেছিল, “একদিন ভেঙে যাবে।” মেঘলা হেসে বলেছিল, “ভেঙে গেলেই কি সবকিছু ফেলে দেয়া যায়? যায় না, বুঝলে।” স্মৃতিটা এত হঠাৎ, এত স্পষ্টভাবে ফিরে এল যে রাইয়্যানের মনে হলো, কেউ যেন তার কানের কাছে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলে গেল। সে কাপটির দিকে হাত বাড়িয়েও ছুঁয়ে দেখলো না, কারণ তার মনে হচ্ছিল, একবার ছুঁয়ে দেখলেই হয়ত তাকে মেনে নিতে হবে- এটা মোটেই কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়।
বিকেল নামার পর দ্বীপের রং বদলে গেল, সূর্যের আলো নরম হতে হতে সমুদ্রের বুকের উপর গলিত তামার মতো ছড়িয়ে পড়ল, আকাশে জমল অস্পষ্ট গোলাপি আভা। রাইয়্যান বারান্দায় বসে ছিল, পাশাপাশি দুটি চেয়ার, সে যে চেয়ারে বসেছিল, তার পাশের চেয়ারটি খালি। কিছুক্ষণ পর সে লক্ষ্য করল, খালি চেয়ারটির ওপর একটি ভাঁজ করা কাপড় রাখা, সকালে সেটা সেখানে ছিল না। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল, কাপড়টা ছিল হালকা ধূসর রঙের একটি শাল। সে হাত দিয়ে স্পর্শ করল, পরিচিত কোনো গন্ধ নেই, কোনো নাম নেই, কিছুই নেই যা প্রমাণ করবে এটি মেঘলার। তবু সে খুব যত্ন করে ভাঁজটা ঠিক করে আবার চেয়ারটির উপর রেখে দিল, এমনভাবে, যেন খুব পরিচিত কেউ পরে এসে সেটা গায়ে জড়াবে।
নিজের এই আচরণের উপর নিজেই বিরক্ত হয়ে সে জোরে বলে উঠল, “আমি কী করছি?”
প্রশ্নটা সে জোরে বলেছিল, উত্তর আসেনি। কিন্তু সে লক্ষ্য করল, তার নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে অদ্ভুত লাগছে, যেন বহুদিন ধরে সে কারও সাথে কথা বলেনি।
সন্ধ্যার একটু আগে রাইয়্যান সমুদ্রের ধারে হাঁটতে বের হলো। এবার সে নিজের পায়ের ছাপগুলো লক্ষ্য করছিল, ঢেউ এসে ধীরে ধীরে সেগুলো মুছে দিচ্ছে। সে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা দূরে চলে গেল, হঠাৎ তার চোখে পড়ল বালির ওপর একটি ছোট পাথরের বৃত্ত। কেউ যেন খুব যত্ন করে পাথরগুলো সাজিয়ে রেখেছে। বৃত্তটির মাঝখানে একটি শুকনো শামুকের খোলস, রাইয়্যান সেখানে বসে পড়ল। তার মনে পড়ল, মেঘলা সমুদ্রতীরে শামুক দেখলেই সবসময় একটা শামুকের খোলস কুড়িয়ে নিত, তারপর কিছুক্ষণ হাতের তালুতে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আবার ফেলে দিত। “নেবে না?” রাইয়্যান একবার জিজ্ঞেস করেছিল। “না,” মেঘলা বলেছিল, “ওটার জায়গা ওখানেই।” রাইয়্যানের বুকের ভেতর হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল, সে চারদিকে তাকাল, কেউ নেই, সমুদ্র, আকাশ আর তার নিজের ছায়া, তবু পাথরগুলো কেউ সাজিয়েছে। সে কি সকালে এখানে এসেছিল?! অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না।
সেই রাতে রাইয়্যান ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি, বিছানায় শুয়ে সমুদ্রের শব্দ শুনছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো দিনের বেলায় যে সমুদ্র প্রায় শব্দহীন ছিল, রাত বাড়ার সাথে সাথে তার ঢেউয়ের আওয়াজ যেন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। কখনো মনে হচ্ছিল, জল তীরে এসে ভাঙছে, আবার কখনো মনে হচ্ছিল, কেউ বাড়ির চারপাশে খুব ধীর পায়ে হাঁটছে। কিন্তু রাইয়্যান জানত, সেখানে কেউ নেই, সে নিজেকেই বারবার সেই কথাটা মনে করিয়ে দিল- আমি একাই এসেছি। রাতের কোনো এক সময় তার ঘুম এসে গিয়েছিল, সকালে ঘুম ভাঙার পর সে প্রথমে বুঝতে পারেনি কী তাকে জাগিয়েছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে, ঘর নিস্তব্ধ, তারপর তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর, সেখানে দুটো কাপ রাখা। একটিতে আগের রাতের কফির শুকিয়ে যাওয়া দাগ, অন্যটিতে চা, ধোঁয়া নেই, কিন্তু চায়ের রং এখনও গাঢ়।
রাইয়্যান বিছানা থেকে উঠে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, সে জানত, দ্বিতীয় কাপটি সে রাখেনি। তারপরও তার প্রথম ভাবনায় এলো- ভোর সকাল করে মেঘলাও এমন কড়া চা খেত; পরক্ষণেই সে এই চিন্তাটার জন্য নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করলো। সে বুঝতে পারছিল, তার অবচেতন মন নিজে থেকেই প্রতিটি ঘটনার সাথে মেঘলাকে জুড়ে দিচ্ছে। নীল রঙা মেঘলার কাপ, ভাজ করা মেঘলার শাল, সমুদ্র তীরে মেঘলার হাতে শামুকের খোলস, আর এখনকার এই কড়া চা — সেটাও মেঘলার। হয়ত এসব কিছুই তাকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে, হয়ত কোম্পানির কোনো অ্যালগরিদম তার স্মৃতির দুর্বল জায়গাগুলো জানে। অথবা… -এই শেষ সম্ভাবনাটাই সে ভাবতে চাইলো না।
দুপুরের দিকে রাইয়্যান বাড়ির ভেতরে আরও কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন দেখতে পেল, বইয়ের তাকের ওপর যে বইটি আগের দিন বন্ধ অবস্থায় ছিল, সেটি এখন খোলা, পাতার মাঝখানে একটি শুকনো পাতা রাখা। রাইয়্যান বইটি তুলে নিল, পাতাটি কোথা থেকে এসেছে, সে জানে না, কিন্তু বইয়ের যে পাতায় সেটি রাখা, সেখানে একটি বাক্য দাগ দেওয়া-
“মানুষ কখনো কখনো ফিরে আসে না, তবু তার জন্য জায়গা থেকে যায়।”
রাইয়্যান বইটি বন্ধ করে ফেলল, তার হাত কাঁপছিল না, সে ভয়ও পাচ্ছিল না, বরং তার ভেতরে অন্যরকম একটা অস্থিরতা তৈরি হচ্ছিল। যদি সত্যিই কেউ এখানে থাকে? আর যদি কেউ না থাকে? এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে কোনটা সে বেশি ভয় পায়, রাইয়্যান বুঝতে পারছিল না। কারণ কেউ থাকলে তাকে এমন কিছু বিশ্বাস করতে হবে, যা বিশ্বাস করা সম্ভব নয়, আর কেউ না থাকলে তাকে স্বীকার করতে হবে, সে নিজেই হয়ত এসব ঘটাচ্ছে- কখনো জেগে, কখনো ঘুমের ভেতর এসব সাজিয়ে যাচ্ছে; এবং পরে কিছুই মনে রাখতে পারছে না, যা হয়ত তার চেয়েও ভয়াবহ।
সেদিন বিকেলে সে সিদ্ধান্ত নিল, আর কোনো কিছু নিয়ে অনুমান করবে না, সে রান্নাঘরের টেবিল পরিষ্কার করে দিল, দুটি কাপ ধুয়ে উলটো করে রাখল, চেয়ার দুটো পাশাপাশি ঠেলে দিল, বারান্দায় থাকা শালটি ভাঁজ করে আলমারির ভেতর রেখে দিল। তারপর সে বাড়ির প্রতিটি ঘর ঘুরে দেখল, কোথাও কেউ নেই, সে দরজা বন্ধ করল, জানালা আটকাল, মেঝের ওপর এক টুকরো বালি ছড়িয়ে দিল, যাতে কেউ হাঁটলে পায়ের ছাপ পড়ে। সবশেষে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল, বিকেল ৫টা ৪০। সে সিদ্ধান্ত নিল, সূর্য ডোবার আগে আর কোথাও যাবে না। বারান্দার চেয়ারে বসে থাকবে, কেউ এলে দেখবে, কেউ না এলে অন্তত নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে।
সূর্য ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছিল, সমুদ্রের ওপর আলো ছোট হয়ে আসছিল, আকাশের রং কমলা থেকে গাঢ় বেগুনিতে বদলে যাচ্ছিল, দ্বীপের বাতাসের নোনা স্বাদের সাথে যেন এক ধরনের চাপা প্রতীক্ষার চাপ তৈরি হতে থাকলো। রাইয়্যান চেয়ারে বসে ছিল, চোখ বাড়ির দরজার দিকে। সময় যাচ্ছিল, কেউ আসেনি, বালির উপর কেন পায়ের ছাপ পড়লো না, কোথাও অস্বাভাবিক কোন শব্দও হলো না।
তারপর হঠাৎ সে খেয়াল করল, বারান্দার অন্য চেয়ারটিতে কেউ বসে নেই ঠিকই, কিন্তু চেয়ারটি সামান্য দোল খাচ্ছে, যেন কেউ একটু আগে উঠে গেছে চেয়ারটি থেকে। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল না, সে নিজের শ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল, “বাতাস”, সে মনে মনে বলল, কিন্তু তার মুখে কথা বেরোল না, কারণ বাতাস থেমে ছিল। কিছুক্ষণ পর বাড়ির ভেতর থেকে একটি শব্দ এল, খুব সাধারণ শব্দ, ড্রয়ারের শব্দ, কেউ যেন রান্নাঘরের ড্রয়ার খুলল। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল, তারপর আবার বসে পড়ল, সে বুঝতে পারছিল, তার শরীর বাড়ির ভেতরে যেতে চাইছে না, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, যদি না যায়, তাহলে বাকি সময়টা সে আর এখানে কাটাতে পারবে না। অনেকক্ষণ পরে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, দরজার কাছে গিয়ে থামল, তারপর ভেতরে ঢুকল, রান্নাঘর ফাঁকা, কিন্তু ড্রয়ারটি খোলা, ভেতরে একটি ছোট নোটবুক রাখা।
রাইয়্যান জানে, নোটবুকটি তার নয়। সে সেটি হাতে নিল, প্রথম কয়েকটি পাতা খালি, তারপর একটি পাতায় লেখা দেখতে পেল। লেখাগুলো কাঁপা কাঁপা নয়, তাড়াহুড়ো করেও লেখা নয়, যেন কেউ শান্তভাবে বসে লিখেছে- “আজ সে আবার চেয়ার দুটো পাশাপাশি রেখে দিয়েছে।”
রাইয়্যানের বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে এল, সে পরের লাইনটি পড়ল- “আজও সে বলবে, সে একা। আমি এখনও তাকে বলিনি যে সে গতকাল রাতে সমুদ্রের ধারে অনেকক্ষণ আমার সাথে বসে ছিল।”
রাইয়্যান আর পড়তে পারল না, সে নোটবুক বন্ধ করে দিল, মনে করার চেষ্টা করল গত রাতের কথা, বিছানায় শোয়ার আগে সে কী করেছিল? সে কি সত্যিই বাইরে গিয়েছিল? তার মনে পড়ল না। এক মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে হলো নোটবুকটি ছিঁড়ে সমুদ্রে ফেলে দিতে। তারপর মনে হলো, সেটা করলে হয়ত সে শুধু প্রমাণটাই নষ্ট করবে, প্রশ্নটা নয়। সে নোটবুকটি টেবিলের ওপর রেখে টেলিপোর্টার প্যাডের দিকে হাঁটল, আজ দ্বিতীয় দিন, আরও চব্বিশ ঘণ্টা পর তার ফেরার অনুমতি।
টেলিপোর্টারের স্ক্রিনের সামনে দাঁড়াল, সেখানে লেখা ছিল- RETURN AVAILABLE IN 23:17:42
তার নিচে আরেকটি লাইন জ্বলছিল- PASSENGERS READY: 1
রাইয়্যান স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, একজন, সে নিজেই, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর সংখ্যাটা ঝিলমিল করে উঠল, তারপর স্ক্রিনে নতুন করে লেখা এল- PASSENGERS READY: 2
রাইয়্যান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, সে পেছনে ঘুরে দেখল, দ্বীপে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে, বাড়ির জানালায় আলো জ্বলছে, বারান্দার দুটি চেয়ার পাশাপাশি, দূর থেকে মনে হলো, একটি চেয়ারে কেউ বসে আছে। রাইয়্যান চোখ কুঁচকে তাকাল, পরের মুহূর্তেই সেখানে শুধু শালটা পড়ে থাকতে দেখল- যেটা সে নিজের হাতে আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখেছিল। সে আবার স্ক্রিনের দিকে তাকাল, সংখ্যাটা তখনো দুই। আর ঠিক তখনই পেছন থেকে খুব ধীরে বাড়ির দরজা খোলার একটা মৃদু শব্দ ভেসে এল।
রাইয়্যান চোখ বন্ধ করল, তার মনে হলো, এই মুহূর্তে তার সামনে দুটো পথ আছে। একটি পথ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই শহরে, যেখানে পাঁচ বছর ধরে সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে মেঘলা আর নেই। অন্য পথটি কোথায় নিয়ে যাবে, সে জানে না, শুধু এটুকু জানে- পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে, অথবা দাঁড়িয়ে নেই।
ঠিক তখনই তার হাতের কনসোলটি কেঁপে উঠল, স্ক্রিনে ফেরার সময় হঠাৎ বদলে গেল- RETURN AVAILABLE NOW
তার নিচে লেখা উঠল- “দয়া করে যাত্রীর সংখ্যা নিশ্চিত করুন।” রাইয়্যান ধীরে ধীরে চোখ খুলল, তার আঙুল দুটি সংখ্যার মাঝখানে স্থির হয়ে রইল- 1 অথবা 2। পেছন থেকে তখন খুব পরিচিত স্বরে কেউ বলল- “রাইয়্যান, এবার কি আমাকে সত্যিই রেখে যাবে?”
রাইয়্যান ঘুরে দাঁড়িয়েছিল কি না, সেটা কোনোদিন জানা যায়নি। পরদিন সকালে তৃতীয় তরঙ্গের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে শুধু একটাই সংকেত পৌঁছেছিল- টেলিপোর্টার প্যাড সক্রিয় হয়েছে, প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, কিন্তু যাত্রীসংখ্যার তথ্য অসম্পূর্ণ।
রাইয়্যানের বুকিং ফাইলের একেবারে শেষ লাইনে, যা পরে কোম্পানির কোনো ইঞ্জিনিয়ার, কোনো অ্যালগরিদম, কোনো তদন্তকারী দল ব্যাখ্যা করতে পারেনি, সেখানে শুধু একটি ছোট্ট নতুন নোট যোগ হয়েছিল লাল অক্ষরে “RETURN NUMBER ERROR!”
সেই দ্বীপে যদি কেউ কোনোদিন আবার যায়, তবে সে হয়ত দেখতে পাবে, বারান্দার দুটো চেয়ার এখনো পাশাপাশি রাখা, একটি চেয়ারের উপর একটি হালকা ধূসর শাল ভাঁজ করা, আর টেবিলের উপর দুটো কাপ। একটি খালি, অন্যটিতে অপেক্ষারত কড়া লিকারের ঠান্ডা চা।
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
Seguindo sugestão dos australianos, Conselho Executivo também recomendou Farmar Aura como nova modalidade olímpica
Da redação de A Gabela — Lausanne
Reportagens como a de Luciana Marschall e Pedro Prata, para o “Estadão Verifica” —
Eu num aeroporto sem nem precisar desses bichos feios para me assustar.
Uma investigação exclusiva de A Gabela revela o que as autoridades insistem em esconder: Anthony Fauci, a verdadeira origem da COVID-19, agentes infiltrados, uma misteriosa substância e uma surpreendente ligação com o programa nuclear iraniano. As provas são incontestáveis.
Da redação de A Gabela
你以為的「安全匿名」,在法律跟技術面前只不過是掩耳盜鈴:




