মানুষ, প্রয়োজন আর অনুভূতির অদ্ভুত হিসাবঃ Rental Family

কিছু সিনেমা আমরা গল্পের টানে দেখি, কিছু দেখি অভিনেতার জন্য। Rental Family (2025) আমার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দলে পড়লেও, সিনেমা শেষ করে উঠে দাঁড়ানোর সময় বুঝলাম- এটা শুধু একজন অভিনেতার কামব্যাক নয়, বরং মানুষের প্রয়োজন, শূন্যতা আর অনুভূতির এক গভীর পাঠ।

ব্রেন্ডন ফ্রেজার – এই নামটা আমার কাছে মানেই সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যুব পথে এগিয়ে যাওয়া বয়সের রোমাঞ্চ। The Mummy, Journey to the Center of the Earth – এই সিনেমাগুলোয় তার উপস্থিতি ছিল প্রাণবন্ত, আত্মবিশ্বাসী, আলোয় ভরা। বহুদিন পর তার চেহারাটি পোস্টারে চোখে পড়তেই যেন পুরোনো স্মৃতি গুলো ঝলমল করে উঠলো, আর সেই টানেই বসে পড়েছিলাম “ভাড়া পরিবার” বা ‘Rental Family’ দেখতে। কিন্তু এবারের ব্রেন্ডন ফ্রেজার ছিলেন একেবারেই ভিন্ন একজন – নীরব, ভাঙা, ক্লান্ত এক মানুষ।

এই সিনেমার Philip চরিত্রটিকে দেখে বারবার মনে হয়েছে, সে যেন ব্রেন্ডন ফ্রেজারের বাস্তব জীবনেরই এক ছায়া। একসময় যিনি অভিনয় জগতে জনপ্রিয়তার শিখরে ছিলেন, আজ তার নামই যেন ভুলে যেতে বসেছে মানুষ। জীবনের দায়ে, টিকে থাকার তাগিদে সে অভিনয় করছে। কিন্তু সেটি কোনো মঞ্চে নয়, বরং মানুষের জীবনের ফাঁকা জায়গাগুলোতে। বাবা নেই এমন শিশুর ভাড়া করা বাবা, পরিবারের সামনে একজন নারীর পরিপূর্ণতা লাভে ভাড়াটে স্বামী – এ যেন অভিনয়েরও আরেক রূপ, যেখানে ক্যামেরা নেই, কিন্তু অনুভূতি আছে।

সিনেমাটি দেখতে দেখতে সবচেয়ে যে ভাবনাটি মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে, তা হলো- মানুষ কত বিচিত্র উপায়ে মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে। সমাজের প্রতিটি শূন্যস্থান কেউ না কেউ এসে ভরাট করে দেয়। কেউ পেশার খাতিরে, কেউ বাঁচার তাগিদে, কেউ বা নিঃসঙ্গতা থেকে। Rental Family যেন সেই অদ্ভুত অথচ বাস্তব পৃথিবীর দরজাটা ধীরে খুলে দেয়, যেখানে ভালোবাসা ভাড়া নেওয়া যায়, পরিবার সাময়িক হয়, কিন্তু অনুভূতিগুলো অস্থায়ী হলেও মিথ্যে নয়।

Philip চরিত্রের সবচেয়ে মানবিক মুহূর্তটি আসে তখনই, যখন সে নিজের বহু কাঠখড় পুড়িয়ে পাওয়া একটি ডিটেকটিভ সিনেমার অফার ফিরিয়ে দেয়। এই শহর, এই দেশ ছেড়ে যেতে হবে- এই শর্তের সামনে দাঁড়িয়ে সে মনে করে ছোট্ট মেয়েটির কথা, যার বাবার ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে সে নিজেই আবেগে জড়িয়ে পড়েছে।

বাস্তবে কোনো সম্পর্ক নেই, কোনো রক্তের টান নেই – তবু সে মেয়েটিকে কথা দিয়েছিল, সে আর তাকে ছেড়ে যাবে না। এই দৃশ্যটি নিঃশব্দে বলে দেয়- অনুভূতির প্রতিশ্রুতি কখনো কখনো জীবনের লক্ষ্যকেও হার মানায়।

সিনেমার আরেকটি গভীরভাবে নাড়া দেওয়া চরিত্র Kikuo Hasegawa। একসময়ের বিখ্যাত অভিনেতা, আজ স্মৃতিভ্রমে আক্রান্ত এক বৃদ্ধ। তার একটাই ইচ্ছা- শৈশবের বাড়ি, যৌবনের স্মৃতি, পরিবার নিয়ে কাটানো গ্রামের সেই নিবাসকে, সেই দিনগুলো আরেকবার দেখে আসা। কিন্তু বয়স আর রোগের দেয়ালে আটকে যায় সেই আকুতি।

নিজের মেয়ের নিষেধ অগ্রাহ্য করে Philip-কে সঙ্গী করে সে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ে। এই যাত্রা শুধু একটি ভ্রমণ নয়, বরং জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বটুকু ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা।

আর Shinji Tada, এই চরিত্রটি যেন সবচেয়ে নগ্ন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মানসিক শান্তির জন্য সে ভাড়া করে নেয় স্ত্রী ও সন্তান। নিজের ভেতরের শূন্যতা ঢাকতে সে মিথ্যের আশ্রয় নেয়, কারণ তার কল্পনার পরিবার বাস্তবে নেই। তবু এই মিথ্যে সম্পর্কের মাঝেও তার বেঁচে থাকার লড়াইটা করুণভাবে সত্য। ⠀⠀⠀⠀ ⠀⠀⠀⠀ ⠀⠀⠀⠀ Rental Family কোনো উচ্চকণ্ঠ সিনেমা নয়। এখানে নেই নাটকীয় সংলাপ, নেই বড়ো কোনো মোড়। কিন্তু প্রতিটি দৃশ্য নিঃশব্দে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়- আমরা কি সত্যিই একা? নাকি প্রয়োজন আর অভিনয়ের মাঝামাঝি কোথাও আমাদের অনুভূতিগুলো সত্যি হয়ে ওঠে?

সিনেমাটি শেষ হওয়ার পর মনে হয়েছে, এই গল্পটা শুধু পর্দার নয়- এটা আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। ভাড়ার সম্পর্ক, অভিনীত অনুভূতি, আর তার ভেতর জন্ম নেওয়া অপ্রত্যাশিত মানবিক বন্ধন- সব মিলিয়ে Rental Family এমন একটি সিনেমা, যা দেখে বেরিয়ে এসে মানুষ আর জীবনের দিকে নতুন করে তাকাতে ইচ্ছে করে।

⠀⠀

যদি আপনি নীরব, মানবিক আর ভাবনার খোরাক দেওয়া সিনেমা পছন্দ করেন, তাহলে এই সিনেমাটি আপনার দেখার তালিকায় থাকতেই পারে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀