ডায়েরির পাতাঃ মনের জ্যোৎস্না ও জ্বর

মৌসুমী ভৌমিকের গানটা আজ হঠাৎ মনে পড়ে গেল- “কেন শুধু শুধু ছুটে চলা, একে একে কথা বলা, নিজের জন্য বাঁচা নিজেকে নিয়ে..”। গানটা কেমন যেন আজকের দিনগুলোর মুখপাত্র হয়ে উঠেছে। শব্দগুলো শুধু সুর নয়, এখন আমার নিঃশ্বাসের অনুষঙ্গ।
দিনগুলি এখন হিসাবের বাইরে, বিচ্ছিন্ন পাথরের মতো যার যার মত ছড়িয়ে পড়ে আছে। গতকালের সকাল আর আজকের বিকালের মধ্যে কোনো সীমানা খুঁজে পাই না। দুই দিনকে আলাদা করার জন্য নতুন কোনো শব্দ নেই অভিধানে। প্রতিদিন একই জানালা, একই আলোছায়া, একই ঘড়ির কাঁটার দৌড়। বিরক্তির ভাঁজ কপালে জমে, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়- এইটুকুই বা কম কী? সময় তো আরো ভাঙচুর করতে পারত, তবু কিছুটা শৃঙ্খলা এখনো টিকে আছে।
গত কয়েকদিন ধরে শরীর বিদ্রোহ করে চলেছে। একদিন তো জ্বর এসে সময়ের হিসাবই লোপাট করে দিল। চোখ মেললাম- সকাল, আবার মেললাম- দুপুর, আরেকবার- দেখলাম সন্ধ্যা ইতোমধ্যে বিদায় জানাচ্ছে। জ্বর যদিও সেরে গেছে, কিন্তু ছেড়ে গেছে গলা-ব্যথা আর তার নিষ্ঠুর সঙ্গী মাথা-ব্যথাকে। সঙ্গে সঙ্গ দেয়ার জন্যে রয়ে গেছে মৃদু কাশি- অতি পরিচিত শত্রু। কাশির স্মৃতি আমার জন্য সাবান পানিতে ভেজা চামড়ার মতো, পুরোনো এক অসুখের ছায়া মনে ভর করে। কখনো কখনো শরীর মনে করিয়ে দেয়, স্মৃতি শুধু মনের নয়, দেহের কোষেও লেখা থাকে।
আগে যা ভালো লাগত, এখন তা ধূসর মনে হয়। বইপত্র, গান, মুভি -সব যেন পানিতে ভেজা ধূসর কাগজের মতো নিষ্প্রাণ। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো- শিশুদের দেখলে আগে যে হৃদয় গলে যেত, এখন সেখানে কোনো না কোনো জায়গায় একটি বিরক্তি দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয়, ওদের কোলাহল থেকে দূরে থাকি, নিঃশব্দে থাকি। এই পরিবর্তনটাই বেশি ভয়ংকর -আগে যা জীবনকে স্পর্শ করত, আজ তা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতায় পরিণত হয়েছে।
ছুটি! শব্দটা এখন প্রার্থনার সমার্থক। কিন্তু, এ ছুটি কেবল দৈনন্দিন রুটিন থেকে নয়, এ ছুটি এই অভ্যন্তরীণ নীরবতা থেকে, এই আবেগহীন প্রবাহ থেকে। কখনো কখনো জীবন থেকেই ছুটি নেওয়ার ইচ্ছে জাগে, একটা দীর্ঘ, শান্ত নিদ্রার মতো। কিন্তু জীবনের প্রতি এক গভীর অনুক্ত মায়া, এখনো রয়ে গেছে। যেমন- একটা পুরোনো বাড়ি, যার দরজা-জানালা ভাঙছে, কিন্তু যার প্রতিটি ধূলিকণায় স্মৃতি লেগে আছে। তাই মায়াটাও এখনো রয়ে গেছে।
জীবন কালের এই বয়সে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি হয় যে, জীবন একইসাথে ‘বোঝা’ ও ‘বরাদ্দ’। অনেকটা পাহাড়ের মাঝপথে উঠে পেছনে ফিরে তাকানোর মতো। নিচের পথটুকু পেরিয়েছি, কিন্তু শীর্ষ ছোঁয়া এখনও বহুদূর। আর শরীরে জমা হয়েছে ক্লান্তি। তবুও এগোতে হচ্ছে, কারণ নিচে নামার পথটা অসম্ভব দুর্গম।
আজকের এই এলোমেলো ভাবনা গুলো ডায়েরির পাতায় লিখে রাখলাম; হয়তো এই শূন্যতা পূর্ণতারই আরেক রূপ। সময় হয়তো হৃদয়কে শূন্য করে তুলছে পরবর্তী কোনো গভীর অনুভবের জন্য জায়গা তৈরি করতে। জ্বর সেরে যাওয়ার পর শরীর যেমন একটু বেশি সংবেদনশীল হয়, তেমনই হয়তো এই আত্মিক স্তব্ধতার পর কিছু দেখা বা বোঝার সূক্ষ্ম ক্ষমতা ফিরে আসবে।
আজ শুধু এই কথাগুলোই লিখে রাখি, যেন এই মুহূর্তের ভার্চুয়াল সাক্ষী থাকে এই শব্দগুলো। হয়তো কোনো এক ভবিষ্যৎ দিনে ফিরে দেখব, এই শব্দগুলো পড়ব, আর তখন বোঝার চেষ্টা করব- যে ব্যক্তি এগুলো লিখেছিল, সে আসলে হারিয়ে যাচ্ছিল নাকি নতুন কোনো উপকূলের খোঁজ পেয়েছিল।
জানালার বাইরে এখন রাত। দূরে কোনো বাড়ির জানালায় একটি বাতি জ্বলে আছে, এক টুকরো মানবিক উষ্ণতা। হয়তো জীবন আসলে এটাই- একটা অন্ধকারে জ্বলা বাতি খোঁজা, যে বাতি হয়তো অন্যের বারান্দায়, কিন্তু তার আলো আমাদের জানালাতেও পড়ে। আজকের মতো এটুকুই যথেষ্ট। আজ শুধু থাকব, আর শ্বাস নেব। এই অস্থির হৃদয় নিয়েই, এই অসুস্থ শরীর নিয়েই, এই স্তব্ধ সময় ধরেই।
⠀⠀
⠀⠀
হয়তো, নিজেকে নিয়ে বেঁচে থাকার অর্থই হলো- এই ভাঙাচোরা মুহূর্তগুলোকেও আস্তে আস্তে, একটু একটু করে, স্পর্শ করে যাওয়া…
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀