ট্রেন মিস করার গল্প...

ট্রেন মিস করার গল্প...

রাত এগারোটা পনেরো। রাশেদ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে, আর তাঁর মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে এইমাত্র সে জানতে পেরেছে যে, পৃথিবীর সব ট্রেন আসলে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করে।

পাঁচ মিনিট আগে তার ট্রেনটা চলে গেছে। রাশেদ দৌড়ে এসেছিল ঠিকই, তবে তাঁর দৌড়ের গতি ছিল সরকারি ফাইলের মতো। ট্রেন তাঁর জন্য দাঁড়ায়নি, শুধু শেষ বগির লাল বাতিটা একবার চোখ টিপে বিদায় জানিয়েছে।

মোবাইলের স্ক্রিনে মিতুর পাঁচটা মিসড কল লেখা ভাসছে। ষষ্ঠবারের মতো ফোন বাজতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল “মিতু ❤️”। রাশেদ অনেকক্ষণ সেই হার্ট চিহ্নটার দিকে তাকিয়ে রইলো। নামটা সেভ করার সময় ইমোজিটা সে নিজেই দিয়েছিলো। এখন মনে হচ্ছে ওটা হার্ট না, ওটা বিস্ফোরকের চিহ্ন!

ফোনটা সে পকেটে চালান করে দিলো। বিপদের সময় ফোন ধরার চেয়ে ফোন না ধরাই নিরাপদ। এটা সে বিয়ের তৃতীয় বছরে শিখেছে, তার জন্য অবশ্য দামটা দিতে হয়েছে এক জোড়া কানের দুল দিয়ে।

চারপাশ ফাঁকা। চায়ের দোকানি ঝাঁপ নামানোর তোড়জোড় করছে। বাতাসে চা, ধোঁয়া আর লোহার গন্ধ। আর রাশেদের মাথায় একের পর এক দুশ্চিন্তা। প্রথমেই মনে পড়লো ছিনতাইয়ের কথা, আর সেটা মনে হতেই আপনা-আপনি হাত চলে গেলো মানিব্যাগের দিকে, তারপর মনে হলো মোবাইলটাও সাথেই আছে, এর সাথে জীবনবীমার পলিসির মেয়াদ কবে শেষ সেটাও মনে পড়ে গেলো। ভয় পাওয়া মন মনে হয় এমনই করে।

ঠিক তখনই সে দেখলো লোকটাকে। প্ল্যাটফর্মের ওপাশে এক বুড়ো মতো মানুষ। গায়ে ময়লা চাদর, মাথায় উশখো-খুশকো কাঁচাপাঁকা চুল, পাশে কাপড়ের থলে। লোকটা একদৃষ্টে রাশেদের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ পিটপিট করছে না। সাপ আর ভূতের পরে এভাবে তাকাতে পারে শুধু পাওনাদার।

বুড়ো ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। রাশেদের হাতের ব্যাগ আপনা-আপনি বুকের সঙ্গে সেঁটে গেল। বুড়ো এক পা, দুই পা, তিন পা করে এগিয়ে এল। রাশেদ মনে কলমা পড়া শুরু করলেন, তবে তাড়াহুড়োয় মাঝখানে ঢুকে গেল কুলহু আল্লাহ সূরা।

— বাবা...

— জি?

— কয়টা টেকা দিবেন?

রাশেদের ভয় নামল, কিন্তু নামার সময় মনে হলো ধপ করে এসে বসল অন্য একটা ভয়ের কাঁধে। ছিনতাইকারী হলে অন্তত বোঝা যেত পরিস্থিতিটা কী। কিন্তু ভদ্রভাবে টাকা চাইলে কী করতে হয়, সেটা তো কোনো স্কুলে শেখায়নি। ব্যাটার অন্য কোন মতলব নেই তো!

— ভয় পাইয়েন না বাবা, আমি চোর না।

— আপনি বুঝলেন কী করে আমি ভয় পাচ্ছি?

— আপনে আমারে দেইখ্যা যেইভাবে ব্যাগটারে ধরছেন, মনে হইতাছে ব্যাগের ভিত্তে বৌমার সব সোনাদানা নিয়া আসছেন।

রাশেদ ব্যাগটা একটু ঢিলে করল। ভেতরে আছে একটা টিফিন বক্স আর আধখাওয়া পানির বোতল।

— দশটা টেকা দেন বাবা।

রাশেদ মানিব্যাগ খুলে দশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিলেন। বুড়ো সেটা না নিয়ে মাথা নাড়লেন।

— না বাবা, বিশ টেকা দেন।

— কিন্তু আপনি না মাত্র বললেন দশ টাকার কথা!

— কইছিলাম। কিন্তু আপনে আমারে দেইখা যেই ভয় পাইছেন তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে আরও দশ টেকা আপনার কাছে আমি প্রাপ্য।

রাশেদ হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। লোকটা রাশেদের এই অবস্থা দেখে হেসে ফেলল। তার হাসিতে আক্রান্ত হয়ে রাসেদের মুখেও হাসি ফুটে উঠলো।

— আপনি ভিক্ষা করেন, নাকি ব্যবসা?

— পরিস্থিতি বুইজ্জা দুইটাই করি।

লোকটার নাম করিম মিয়া। এই স্টেশনই তাঁর ঠিকানা। রাশেদ তাকে বিশ টাকা দিলো। করিম মিয়া নোটটা ভাঁজ করে চাদরের ভেতর চালান করে দিলো। সেই হাতের ক্ষিপ্রতা দেখলে যে কোনো ম্যাজিশিয়ান লজ্জা পেত।

— একটা কথা বাবা, আপনার কি টেরেন মিস হইসে?

— আপনি বুঝলেন কী করে? জ্যোতিষী নাকি?

— না, আপনে পাঁচ মিনিটে এগারোবার ঘড়ি দেখছেন, আমি ঐখান থাইক্যা গুনছি। আর আপনের কপালে লেখা দেখতেছি, “আইজ আমার বউ আমারে মাইরা ফেলবে”।

— এতটাই স্পষ্ট?

— সাইনবোর্ডের মতো ফকফকা।

করিম মিয়া পাশে এসে বসে পড়লো, যেন রাশেদ তাঁর বহুদিনের মক্কেল।

— আপনার ইস্তিরি ফোন করছে?

— পাঁচবার।

— ধরছেন?

— প্রথম দুইবার ধরেছিলাম।

— হেরপর?

— তারপর আর সাহস হয়নি।

— সত্য কথা কইলেই তো হয়।

— এখন সত্যি বললে বিপদ বাড়বে।

— আর মিথ্যা কইলে?

— সেটা পরে সামলানো যাবে।

করিম মিয়া গম্ভীর মুখে মাথা দুলিয়ে বললেন, “সংসার বড় কঠিন জায়গা বাবা। এইখানে সত্যও বিপদ, আবার মিথ্যাও বিপদ। সবচাইতে নিরাপদ হইলো টেরেন মিস না করা।”

— সেটা এখন বলে লাভ কী!

— সেইটাও হক কথা।

তখনই লাউডস্পিকারে ভাঙা গলায় ঘোষণা হলো, “পরবর্তী ট্রেন......” তারপর খড়খড় শব্দ করে সব চুপ।

— এই মাইকটা আমার চেয়েও বুড়া, বললেন করিম মিয়া।

— ট্রেন আসতে এখনও বিশ মিনিটের মতো বাকি।

— তাইলে চলেন চা খাই।

— এত রাতে চা? ঘুম আসবে না তো।

— বাড়ি গিয়া আপনে ঘুমানের সুযোগ পাইবেন বইলা মনে হয়?

রাশেদ এবার শব্দ করে হেসে ফেললেন। অনেকদিন পর এভাবে হাসলেন।

চায়ের দোকানি তখন ঝাঁপ প্রায় নামিয়ে ফেলেছে। করিম মিয়া হাঁক দিলেন, “ঐ ছ্যাড়া দুই কাপ দে, একটা আমারে, একটা ভদ্দরলোকেরে”।

— আমি চা খাব না।

— খান বাবা। আপনের চেহারা দেইখা মনে হইতাছে যে নিজের ভুলের লাইগা আপনে এহনই একটা কমিটি বানাইবেন, হেরপর হেরা আপনের এই ভুল শুধরাইয়া দিবো; এত চিন্তা বাদ দিয়া একটা চা খান আমার লগে।

কিছুক্ষন বাদেই চা চলে আসলো। দারুণ গরম চা, আদার গন্ধ। রাশেদ এক চুমুক দিয়ে অবাক হলো। এত রাতে, এমন জায়গায়, এত ভালো চা!

চা খেতে খেতে করিম মিয়া নিজের গল্প বললেন। একসময় রেলের কুলি ছিলেন। সংসার ছিল, ছেলেমেয়ে হলো, তারপর সবাই যে যার পথে চলে গেল।

— আপনার বাড়ি নেই?

করিম মিয়া রেল লাইনের দিকে তাকিয়ে একটু চুপ করে রইলেন।

— ছিল একসময়, এহন এই ইস্টিশনই আমার বাড়ি।

রাশেদ কী বলবে ভেবে পেলো না। কিন্তু করিম মিয়া নিজেই হেসে উঠলো।

— তয় একটা সুবিধা আছে, এই বাড়ির কোন ভাড়া দেওন লাগে না।

দুজনেই হাসলো। রাশেদের ভেতরের ভার খানিকটা নেমে গেল।

হঠাৎ করিম মিয়া বলল, “এইবার বৌমারে একটা ফোন দেন।”

— এখন?

— হ, এহনই। ফোন দিয়া কইবেন যে আপনে টেরেন মিস করেছেন।

— তারপর?

— হেরপর চুপ থাকবেন।

— যদি জিজ্ঞেস করে, কীভাবে মিস করলাম?

— কইবেন, পক‍্কিতির নিয়ম।

রাশেদ কাঁপা হাতে ফোন করলো। প্রথম রিংয়েই ওপাশ থেকে গম্ভীর গলা, “কোথায়?”

— স্টেশনে।

— ট্রেন?

— মিস করেছি।

নীরবতা। রাশেদ চোখ বন্ধ করে ফেললো। মনে হলো এই নীরবতার মধ্যেই তাঁর ভাগ্য ঝুলছে। তারপর মিতু বলল, “তুমি একটা অদ্ভুত মানুষ”।

— জানি।

— কতক্ষণ লাগবে?

— দশ-পনেরো মিনিট।

— ঠিক আছে, সাবধানে এসো।

ফোন কেটে গেল। রাশেদ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন ওটা এইমাত্র আলাদিনের চেরাগের মতো কাজ করেছে।

— দেখলেন? সত্য কইলেই বউ মারে না।

— আপনি এত জানেন কী করে?

— চল্লিশ বছর সংসার করছি না!

— করেছিলেন? আর এখন?

— ইস্তিরি মারা গেছে।

করিম মিয়া একটু থামলেন। তারপর হালকা গলায় বললেন, “অহন ঐ বেডির বকবকানিডাই মনে পরে”।

রাশেদ আর কিছু বললেন না।

দূরে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল। করিম মিয়া উঠে দাঁড়ালেন।

— আফনের টেরেন।

রাশেদ পকেট থেকে কিছু টাকা বের করতে গেলো, তার আগেই করিম মিয়া হাত তুলে থামিয়ে দিলো।

— রাহেন। আইজ আফনে আমার লগে বইয়া চা খাইছেন, এইডাই অনেক। টেকাটা দিয়া বৌমার লইগা সুন্দর দেইহা ফুল কিন্না লইয়া যাইয়েন।

— ফুল?

— হ, টেরেন মিস করার ক্ষতিপূরণ, সংসারের ক্ষতিপূরণ।

রাশেদ হাসতে হাসতে জিজ্ঞাস করলো, “আপনি আসলে ভিক্ষুক না, উপদেষ্টা?”

— পরিস্থিতি বুইজ্জা দুইটাই।

ট্রেন ছেড়ে দিল। জানালার পাশে বসে রাশেদ দেখলো, করিম মিয়া প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন, যেন খুব আত্নীয় কেউ বিদায় জানাচ্ছে। ট্রেন চলতে চলতে স্টেশনটা একসময় ছোট হতে হতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো।

রাশেদ মোবাইলে মিতুকে লিখলো, “ট্রেন মিস করে এক দারুণ মানুষের দেখা পেলাম। বাড়ি গিয়ে সব বলব। আর শোনো, ফুল নিয়ে আসছি।”

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল: “ফুল? তুমি? কী করেছ সত্যি করে বলো!”

রাশেদ ফোনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কিছু কিছু ভালো কাজের পরেও সন্দেহ থেকে যায়, সেটাই হয়তো সংসারের নিয়ম।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀