<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0" xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/">
  <channel>
    <title>লোকমানুষ এর ব্লগ</title>
    <link>https://infosec.press/lokmanus/</link>
    <description>এক টুকরো আকাশ, এক মুঠো মাটির গল্প...</description>
    <pubDate>Sat, 10 Oct 2026 23:49:19 +0000</pubDate>
    <item>
      <title>বিদায়, নানা পাটেকর :: একটি সময়ের সমাপ্তিু...</title>
      <link>https://infosec.press/lokmanus/bidaay-naanaa-paattekr-ektti-smy-er-smaaptiu</link>
      <description>&lt;![CDATA[বিদায়, নানা পাটেকর - একটি সময়ের সমাপ্তিু&#xA;&#xA;কিছু মানুষ চলে গেলে আমরা কেবল মানুষের শূন্যতা অনুভব করি। আর কিছু মানুষ চলে গেলে মনে হয়, আমাদের চেনা একটা সময়ই হারিয়ে গেল। আজ ৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার বাড়িতে হঠাৎ হৃদ্‌রোগে থেমে গেলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। সারা ভারত যাঁকে ডাকত ‘নানা’ বলে। খবরটা শোনার পর প্রথমে কারও মনে পড়বে একটা তীক্ষ্ণ সংলাপ, কারও একজোড়া স্থির চোখ, কারও ‘ক্রান্তিবীর’-এর সেই আগুনঝরা গলা। কিন্তু একটু পরেই টের পাওয়া যায়, শুধু সিনেমার স্মৃতি দিয়ে এই মানুষটিকে বিদায় জানানো যায় না। পর্দার নানাকে আমরা চিনেছি, আর পর্দার বাইরের নানা ছিলেন তাঁর চেয়েও অনেক বড়।&#xA;!--more--&#xA;তাঁর শৈশব বলে কিছু ছিল না। তেরো বছর বয়সে বাবার ব্যবসা ভেঙে গেল, আর ছেলেটি সিনেমার পোস্টার এঁকে সংসারের হাল ধরতে নামল। মাসে পেত পঁয়ত্রিশ টাকা আর একবেলা খাবার। রোজ প্রায় আট কিলোমিটার হেঁটে কাজে যেত। কলেজে পড়ার সময় রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং এঁকেও পয়সা জোগাড় করেছে। এই গল্প শুনে আমরা সহজেই বলে ফেলি, কী কষ্টের জীবন। অথচ নানা সেই কষ্টকে কখনো নালিশের জায়গা বানাননি। ক্ষুধা আর অপমান তিনি নিজের শরীরে চিনেছিলেন বলেই পর্দায় তাঁর দরিদ্র, ক্ষুব্ধ বা পরাজিত মানুষগুলোকে কখনো অভিনয় মনে হয়নি। মনে হতো, কেউ নিজের জীবনটাই সামনে এনে রেখেছে।&#xA;&#xA;‘পরিন্দা’য় তিনি এমন এক অন্ধকার তৈরি করেছিলেন, যা শুধু একটা খলচরিত্রের ছিল না, ছিল ভয়ের সরাসরি উপস্থিতি। ‘ক্রান্তিবীর’-এ তাঁর কণ্ঠ সংলাপ বলত না, ফেটে পড়ত। ‘প্রহার’-এর কঠোর সৈনিকের ভেতরেও তিনি একজন কোমল মানুষকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। ‘অব তক ছাপ্পান’ আমাদের শিখিয়ে দিয়েছিল, সব অভিনয়ে চিৎকার লাগে না, কখনো একটা তাকানোই যথেষ্ট। আর ‘নটসম্রাট’-এ তাঁর সারা জীবনের একাকিত্ব, অহংকার, ভালোবাসা আর হারানোর ব্যথা যেন একসঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছিল। ভেঙে পড়া সেই বৃদ্ধকে তিনি এমনভাবে বাঁচিয়েছিলেন যে দর্শক একসময় চরিত্রটার কথা ভুলে গিয়ে মানুষটার জন্যই কষ্ট পেতে শুরু করেছিল। নানাকে নকল করা যায়, তাঁর সংলাপ বা ভঙ্গি মুখস্থ করে ফেলা যায়। কিন্তু তাঁর মতো নীরব থাকা কেউ শেখেনি, শিখবেও না।&#xA;&#xA;তিনটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, পদ্মশ্রী পেয়েছেন। তবু সেই আলো তাঁর গায়ে কখনো তারকার অহংকার হয়ে লেগে থাকেনি। কোটি টাকা রোজগারের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি থেকেছেন সাধারণ ফ্ল্যাটে, সময় কাটিয়েছেন গ্রামের বাড়িতে। ১৯৭৮ সালে নীলকান্তিকে বিয়ে করেছিলেন মাত্র সাতশো পঞ্চাশ টাকা খরচ করে। বিয়ের পর পকেটে বাকি ছিল চব্বিশ টাকা, সেই টাকায় অতিথিদের জন্য কিনে এনেছিলেন গোল্ড স্পট। এমন বিয়ের গল্প কোনো তারকার জীবনে শোনা যায় না। হয়তো তিনি আগেই বুঝে গিয়েছিলেন, জীবনের দাম জিনিসের দামে মাপা হয় না।&#xA;&#xA;একবার ‘ক্রান্তিবীর’-এর জন্য নিজের বাড়ি পর্যন্ত বন্ধক রেখেছিলেন। ছবি সফল হওয়ার পর পরিচালক তাঁকে একটা স্কুটার উপহার দিলেন, আর সেটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম নিজস্ব বাহন। ভাবলে চোখ ভিজে আসে। যে মানুষ পরে কোটি টাকার পারিশ্রমিক নিতে পারতেন, তাঁর প্রথম গাড়ি ছিল দুই চাকার একটা উপহার। হলিউড থেকেও ডাক এসেছিল। রিডলি স্কটের সঙ্গে কাজের সুযোগ, লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর সঙ্গে অভিনয়ের সম্ভাবনা। কিন্তু চরিত্রটি এক সন্ত্রাসীর শুনে তিনি মুখের ওপরই না বলে দিয়েছিলেন। সব সুযোগ লুফে নেওয়ার মানুষ তিনি ছিলেন না। নিজের কাছে নিজের একটা সীমারেখা ছিল, আর সেটাকে তিনি সারা জীবন সম্মান করেছেন।&#xA;&#xA;নানা সবচেয়ে বেশি মানুষ হয়ে উঠেছিলেন পর্দার বাইরে। ২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রের খরা আর কৃষকদের আত্মহত্যার খবর তাঁকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি খবর পড়ে বসে থাকেননি, নিজে গিয়েছিলেন সেই পরিবারগুলোর দরজায়। কিন্তু একবার টাকা দিয়ে চলে এলে যে মানুষের জীবন বদলায় না, সেটা তিনি খুব তাড়াতাড়ি বুঝেছিলেন। তাই মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে গড়ে তুললেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। জল ধরে রাখা, শুকিয়ে যাওয়া জলাধার ফিরিয়ে আনা, কৃষকের হাতে ভরসা তুলে দেওয়া, এই কাজগুলো ধীরে ধীরে গ্রামের পর গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। এটাই ছিল তাঁর দূরদৃষ্টি। দান একটা দিনের স্বস্তি দেয়, কিন্তু জল আর কাজ আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জোর দেয় বছরের পর বছরের ভরসা। অথচ এই কাজ নিয়ে ঢাকঢোল পেটানো তাঁর স্বভাবে ছিল না। লোকে দীপাবলিতে আতশবাজি কিনলে তিনি খুশি হতেন কারও ঘরে একটু আলো পৌঁছে দিতে পেরে।&#xA;&#xA;১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় তিনি ষাট দিন সেখানে কাটিয়েছিলেন। পরে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে জবাব দিয়েছিলেন, দেশের জন্য এটুকু তো করাই যায়। এত বড় একটা কাজকে এত ছোট করে বলার ক্ষমতা সবার থাকে না। এই সরলতাই ছিল তাঁর আসল পরিচয়।&#xA;&#xA;আর মৃত্যু নিয়ে তাঁর যে রসিকতা, সেটা মনে পড়লে আজ বুক মুচড়ে ওঠে। বহু বছর আগে তিনি নিজের শেষযাত্রার জন্য বারো মণ কাঠ আলাদা করে রেখেছিলেন, আর সবটাই শুকনো কাঠ। কারণ জিজ্ঞেস করলে হেসে বলতেন, ভেজা কাঠে ধোঁয়া হয়, ধোঁয়ায় লোকের চোখে জল আসে, তখন সবাই ভাবে আমার জন্য কাঁদছে। আমি ভুল বোঝাতে চাই না। হাসির আড়ালে তিনি আসলে একটা গভীর সত্য বলে গিয়েছিলেন। মানুষ কাঁদবে, তারপর ঘরে ফিরবে, বাজার খুলবে, ট্রেন চলবে, নতুন অভিনেতা আসবে। তাই বেঁচে থাকার সময়টুকুই আসল। জীবনকে তিনি তাই বেশি গম্ভীর করে নেননি, অথচ ভেতরে ভেতরে ভেবেছেন তাকে নিয়ে অনেক গভীরভাবে।&#xA;&#xA;পর্দায় এত রাগ, বাস্তবে এত মায়া। পর্দায় এত কঠিন, মানুষের কষ্টের সামনে এত নরম। জীবন তাঁকে সহজ কিছু দেয়নি, কিন্তু তিনিও জীবনকে কখনো জিততে দেননি। কখনো রাগ করে, কখনো হেসে, কখনো মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, কখনো মৃত্যুকে নিয়েও ঠাট্টা করে তিনি নিজের মতো করে বেঁচে গেছেন।&#xA;&#xA;আজ থেকে নতুন কোনো পোস্টারে আর তাঁর মুখ থাকবে না। কোনো পরিচালক আর বলবেন না, এই চরিত্রটা নানার জন্য। কিন্তু ‘পরিন্দা’ দেখলে আমাদের তাঁকে মনে পড়বে, ‘ক্রান্তিবীর’ দেখলে বুকের ভেতর আবার আগুন জ্বলবে, ‘ওয়েলকাম’ দেখলে আমরা না হেসে পারব না। আর ‘নটসম্রাট’ দেখতে বসলে একসময় হাসতে হাসতেই চোখ ভিজে যাবে। সেই চোখের জল দেখে তিনি হয়তো কোথাও বসে মুচকি হাসছেন, আর বলছেন, বলেছিলাম না, ভেজা কাঠ ব্যবহার কোরো না।&#xA;&#xA;বিদায়, নানা। বিদায় সেই কিশোরকে, যে পঁয়ত্রিশ টাকার জন্য পোস্টার আঁকত। বিদায় সেই অভিনেতাকে, যাঁর চোখ কথা বলত। বিদায় সেই মানুষটিকে, যিনি খ্যাতির চেয়ে মানুষের কষ্টকে বড় করে দেখেছিলেন। আপনি অনেক চরিত্রে অভিনয় করেছেন, কিন্তু জীবনটাকে কখনো অভিনয় করেননি। হয়তো সেটাই ছিল আপনার সবচেয়ে বড় অভিনয়। আপনার মতো মানুষ আসলে পুরোপুরি চলে যান না। তাঁরা থেকে যান কোনো সংলাপে, কোনো কৃষকের হাসিতে, কোনো শুকনো জলাধারে ফিরে আসা জলে, আর পুরোনো সিনেমা চলতে থাকা টেলিভিশনের সামনে বসা কোনো দর্শকের ভেজা চোখে।&#xA;&#xA;শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বিদায়, নানা পাটেকর।⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀]]&gt;</description>
      <content:encoded><![CDATA[<p><img src="https://i.ibb.co/HLyrDYj0/PI-Web-Nana-Patekar.jpg" alt="বিদায়, নানা পাটেকর - একটি সময়ের সমাপ্তিু"></p>

<p>কিছু মানুষ চলে গেলে আমরা কেবল মানুষের শূন্যতা অনুভব করি। আর কিছু মানুষ চলে গেলে মনে হয়, আমাদের চেনা একটা সময়ই হারিয়ে গেল। আজ ৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার বাড়িতে হঠাৎ হৃদ্‌রোগে থেমে গেলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। সারা ভারত যাঁকে ডাকত ‘নানা’ বলে। খবরটা শোনার পর প্রথমে কারও মনে পড়বে একটা তীক্ষ্ণ সংলাপ, কারও একজোড়া স্থির চোখ, কারও ‘ক্রান্তিবীর’-এর সেই আগুনঝরা গলা। কিন্তু একটু পরেই টের পাওয়া যায়, শুধু সিনেমার স্মৃতি দিয়ে এই মানুষটিকে বিদায় জানানো যায় না। পর্দার নানাকে আমরা চিনেছি, আর পর্দার বাইরের নানা ছিলেন তাঁর চেয়েও অনেক বড়।

তাঁর শৈশব বলে কিছু ছিল না। তেরো বছর বয়সে বাবার ব্যবসা ভেঙে গেল, আর ছেলেটি সিনেমার পোস্টার এঁকে সংসারের হাল ধরতে নামল। মাসে পেত পঁয়ত্রিশ টাকা আর একবেলা খাবার। রোজ প্রায় আট কিলোমিটার হেঁটে কাজে যেত। কলেজে পড়ার সময় রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং এঁকেও পয়সা জোগাড় করেছে। এই গল্প শুনে আমরা সহজেই বলে ফেলি, কী কষ্টের জীবন। অথচ নানা সেই কষ্টকে কখনো নালিশের জায়গা বানাননি। ক্ষুধা আর অপমান তিনি নিজের শরীরে চিনেছিলেন বলেই পর্দায় তাঁর দরিদ্র, ক্ষুব্ধ বা পরাজিত মানুষগুলোকে কখনো অভিনয় মনে হয়নি। মনে হতো, কেউ নিজের জীবনটাই সামনে এনে রেখেছে।</p>

<p>‘পরিন্দা’য় তিনি এমন এক অন্ধকার তৈরি করেছিলেন, যা শুধু একটা খলচরিত্রের ছিল না, ছিল ভয়ের সরাসরি উপস্থিতি। ‘ক্রান্তিবীর’-এ তাঁর কণ্ঠ সংলাপ বলত না, ফেটে পড়ত। ‘প্রহার’-এর কঠোর সৈনিকের ভেতরেও তিনি একজন কোমল মানুষকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। ‘অব তক ছাপ্পান’ আমাদের শিখিয়ে দিয়েছিল, সব অভিনয়ে চিৎকার লাগে না, কখনো একটা তাকানোই যথেষ্ট। আর ‘নটসম্রাট’-এ তাঁর সারা জীবনের একাকিত্ব, অহংকার, ভালোবাসা আর হারানোর ব্যথা যেন একসঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছিল। ভেঙে পড়া সেই বৃদ্ধকে তিনি এমনভাবে বাঁচিয়েছিলেন যে দর্শক একসময় চরিত্রটার কথা ভুলে গিয়ে মানুষটার জন্যই কষ্ট পেতে শুরু করেছিল। নানাকে নকল করা যায়, তাঁর সংলাপ বা ভঙ্গি মুখস্থ করে ফেলা যায়। কিন্তু তাঁর মতো নীরব থাকা কেউ শেখেনি, শিখবেও না।</p>

<p>তিনটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, পদ্মশ্রী পেয়েছেন। তবু সেই আলো তাঁর গায়ে কখনো তারকার অহংকার হয়ে লেগে থাকেনি। কোটি টাকা রোজগারের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি থেকেছেন সাধারণ ফ্ল্যাটে, সময় কাটিয়েছেন গ্রামের বাড়িতে। ১৯৭৮ সালে নীলকান্তিকে বিয়ে করেছিলেন মাত্র সাতশো পঞ্চাশ টাকা খরচ করে। বিয়ের পর পকেটে বাকি ছিল চব্বিশ টাকা, সেই টাকায় অতিথিদের জন্য কিনে এনেছিলেন গোল্ড স্পট। এমন বিয়ের গল্প কোনো তারকার জীবনে শোনা যায় না। হয়তো তিনি আগেই বুঝে গিয়েছিলেন, জীবনের দাম জিনিসের দামে মাপা হয় না।</p>

<p>একবার ‘ক্রান্তিবীর’-এর জন্য নিজের বাড়ি পর্যন্ত বন্ধক রেখেছিলেন। ছবি সফল হওয়ার পর পরিচালক তাঁকে একটা স্কুটার উপহার দিলেন, আর সেটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম নিজস্ব বাহন। ভাবলে চোখ ভিজে আসে। যে মানুষ পরে কোটি টাকার পারিশ্রমিক নিতে পারতেন, তাঁর প্রথম গাড়ি ছিল দুই চাকার একটা উপহার। হলিউড থেকেও ডাক এসেছিল। রিডলি স্কটের সঙ্গে কাজের সুযোগ, লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর সঙ্গে অভিনয়ের সম্ভাবনা। কিন্তু চরিত্রটি এক সন্ত্রাসীর শুনে তিনি মুখের ওপরই না বলে দিয়েছিলেন। সব সুযোগ লুফে নেওয়ার মানুষ তিনি ছিলেন না। নিজের কাছে নিজের একটা সীমারেখা ছিল, আর সেটাকে তিনি সারা জীবন সম্মান করেছেন।</p>

<p>নানা সবচেয়ে বেশি মানুষ হয়ে উঠেছিলেন পর্দার বাইরে। ২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রের খরা আর কৃষকদের আত্মহত্যার খবর তাঁকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি খবর পড়ে বসে থাকেননি, নিজে গিয়েছিলেন সেই পরিবারগুলোর দরজায়। কিন্তু একবার টাকা দিয়ে চলে এলে যে মানুষের জীবন বদলায় না, সেটা তিনি খুব তাড়াতাড়ি বুঝেছিলেন। তাই মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে গড়ে তুললেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। জল ধরে রাখা, শুকিয়ে যাওয়া জলাধার ফিরিয়ে আনা, কৃষকের হাতে ভরসা তুলে দেওয়া, এই কাজগুলো ধীরে ধীরে গ্রামের পর গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। এটাই ছিল তাঁর দূরদৃষ্টি। দান একটা দিনের স্বস্তি দেয়, কিন্তু জল আর কাজ আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জোর দেয় বছরের পর বছরের ভরসা। অথচ এই কাজ নিয়ে ঢাকঢোল পেটানো তাঁর স্বভাবে ছিল না। লোকে দীপাবলিতে আতশবাজি কিনলে তিনি খুশি হতেন কারও ঘরে একটু আলো পৌঁছে দিতে পেরে।</p>

<p>১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় তিনি ষাট দিন সেখানে কাটিয়েছিলেন। পরে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে জবাব দিয়েছিলেন, দেশের জন্য এটুকু তো করাই যায়। এত বড় একটা কাজকে এত ছোট করে বলার ক্ষমতা সবার থাকে না। এই সরলতাই ছিল তাঁর আসল পরিচয়।</p>

<p>আর মৃত্যু নিয়ে তাঁর যে রসিকতা, সেটা মনে পড়লে আজ বুক মুচড়ে ওঠে। বহু বছর আগে তিনি নিজের শেষযাত্রার জন্য বারো মণ কাঠ আলাদা করে রেখেছিলেন, আর সবটাই শুকনো কাঠ। কারণ জিজ্ঞেস করলে হেসে বলতেন, ভেজা কাঠে ধোঁয়া হয়, ধোঁয়ায় লোকের চোখে জল আসে, তখন সবাই ভাবে আমার জন্য কাঁদছে। আমি ভুল বোঝাতে চাই না। হাসির আড়ালে তিনি আসলে একটা গভীর সত্য বলে গিয়েছিলেন। মানুষ কাঁদবে, তারপর ঘরে ফিরবে, বাজার খুলবে, ট্রেন চলবে, নতুন অভিনেতা আসবে। তাই বেঁচে থাকার সময়টুকুই আসল। জীবনকে তিনি তাই বেশি গম্ভীর করে নেননি, অথচ ভেতরে ভেতরে ভেবেছেন তাকে নিয়ে অনেক গভীরভাবে।</p>

<p>পর্দায় এত রাগ, বাস্তবে এত মায়া। পর্দায় এত কঠিন, মানুষের কষ্টের সামনে এত নরম। জীবন তাঁকে সহজ কিছু দেয়নি, কিন্তু তিনিও জীবনকে কখনো জিততে দেননি। কখনো রাগ করে, কখনো হেসে, কখনো মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, কখনো মৃত্যুকে নিয়েও ঠাট্টা করে তিনি নিজের মতো করে বেঁচে গেছেন।</p>

<p>আজ থেকে নতুন কোনো পোস্টারে আর তাঁর মুখ থাকবে না। কোনো পরিচালক আর বলবেন না, এই চরিত্রটা নানার জন্য। কিন্তু ‘পরিন্দা’ দেখলে আমাদের তাঁকে মনে পড়বে, ‘ক্রান্তিবীর’ দেখলে বুকের ভেতর আবার আগুন জ্বলবে, ‘ওয়েলকাম’ দেখলে আমরা না হেসে পারব না। আর ‘নটসম্রাট’ দেখতে বসলে একসময় হাসতে হাসতেই চোখ ভিজে যাবে। সেই চোখের জল দেখে তিনি হয়তো কোথাও বসে মুচকি হাসছেন, আর বলছেন, বলেছিলাম না, ভেজা কাঠ ব্যবহার কোরো না।</p>

<p>বিদায়, নানা। বিদায় সেই কিশোরকে, যে পঁয়ত্রিশ টাকার জন্য পোস্টার আঁকত। বিদায় সেই অভিনেতাকে, যাঁর চোখ কথা বলত। বিদায় সেই মানুষটিকে, যিনি খ্যাতির চেয়ে মানুষের কষ্টকে বড় করে দেখেছিলেন। আপনি অনেক চরিত্রে অভিনয় করেছেন, কিন্তু জীবনটাকে কখনো অভিনয় করেননি। হয়তো সেটাই ছিল আপনার সবচেয়ে বড় অভিনয়। আপনার মতো মানুষ আসলে পুরোপুরি চলে যান না। তাঁরা থেকে যান কোনো সংলাপে, কোনো কৃষকের হাসিতে, কোনো শুকনো জলাধারে ফিরে আসা জলে, আর পুরোনো সিনেমা চলতে থাকা টেলিভিশনের সামনে বসা কোনো দর্শকের ভেজা চোখে।</p>

<p>শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বিদায়, নানা পাটেকর।⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>
]]></content:encoded>
      <guid>https://infosec.press/lokmanus/bidaay-naanaa-paattekr-ektti-smy-er-smaaptiu</guid>
      <pubDate>Thu, 08 Oct 2026 16:00:00 +0000</pubDate>
    </item>
    <item>
      <title>ট্রেন মিস করার গল্প...</title>
      <link>https://infosec.press/lokmanus/story-train-miss-korar-golpo</link>
      <description>&lt;![CDATA[ট্রেন মিস করার গল্প...&#xA;&#xA;রাত এগারোটা পনেরো। রাশেদ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে, আর তাঁর মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে এইমাত্র সে জানতে পেরেছে যে, পৃথিবীর সব ট্রেন আসলে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করে।&#xA;&#xA;পাঁচ মিনিট আগে তার ট্রেনটা চলে গেছে। রাশেদ দৌড়ে এসেছিল ঠিকই, তবে তাঁর দৌড়ের গতি ছিল সরকারি ফাইলের মতো। ট্রেন তাঁর জন্য দাঁড়ায়নি, শুধু শেষ বগির লাল বাতিটা একবার চোখ টিপে বিদায় জানিয়েছে।&#xA;!--more--&#xA;মোবাইলের স্ক্রিনে মিতুর পাঁচটা মিসড কল লেখা ভাসছে। ষষ্ঠবারের মতো ফোন বাজতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল &#34;মিতু ❤️&#34;। রাশেদ অনেকক্ষণ সেই হার্ট চিহ্নটার দিকে তাকিয়ে রইলো। নামটা সেভ করার সময় ইমোজিটা সে নিজেই দিয়েছিলো। এখন মনে হচ্ছে ওটা হার্ট না, ওটা বিস্ফোরকের চিহ্ন!&#xA;&#xA;ফোনটা সে পকেটে চালান করে দিলো। বিপদের সময় ফোন ধরার চেয়ে ফোন না ধরাই নিরাপদ। এটা সে বিয়ের তৃতীয় বছরে শিখেছে, তার জন্য অবশ্য দামটা দিতে হয়েছে এক জোড়া কানের দুল দিয়ে।&#xA;&#xA;চারপাশ ফাঁকা। চায়ের দোকানি ঝাঁপ নামানোর তোড়জোড় করছে। বাতাসে চা, ধোঁয়া আর লোহার গন্ধ। আর রাশেদের মাথায় একের পর এক দুশ্চিন্তা। প্রথমেই মনে পড়লো ছিনতাইয়ের কথা, আর সেটা মনে হতেই আপনা-আপনি হাত চলে গেলো মানিব্যাগের দিকে, তারপর মনে হলো মোবাইলটাও সাথেই আছে, এর সাথে জীবনবীমার পলিসির মেয়াদ কবে শেষ সেটাও মনে পড়ে গেলো। ভয় পাওয়া মন মনে হয় এমনই করে।&#xA;&#xA;ঠিক তখনই সে দেখলো লোকটাকে। প্ল্যাটফর্মের ওপাশে এক বুড়ো মতো মানুষ। গায়ে ময়লা চাদর, মাথায় উশখো-খুশকো কাঁচাপাঁকা চুল, পাশে কাপড়ের থলে। লোকটা একদৃষ্টে রাশেদের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ পিটপিট করছে না। সাপ আর ভূতের পরে এভাবে তাকাতে পারে শুধু পাওনাদার।&#xA;&#xA;বুড়ো ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। রাশেদের হাতের ব্যাগ আপনা-আপনি বুকের সঙ্গে সেঁটে গেল। বুড়ো এক পা, দুই পা, তিন পা করে এগিয়ে এল। রাশেদ মনে কলমা পড়া শুরু করলেন, তবে তাড়াহুড়োয় মাঝখানে ঢুকে গেল কুলহু আল্লাহ সূরা।&#xA;&#xA;— বাবা...&#xA;&#xA;— জি?&#xA;&#xA;— কয়টা টেকা দিবেন?&#xA;&#xA;রাশেদের ভয় নামল, কিন্তু নামার সময় মনে হলো ধপ করে এসে বসল অন্য একটা ভয়ের কাঁধে। ছিনতাইকারী হলে অন্তত বোঝা যেত পরিস্থিতিটা কী। কিন্তু ভদ্রভাবে টাকা চাইলে কী করতে হয়, সেটা তো কোনো স্কুলে শেখায়নি। ব্যাটার অন্য কোন মতলব নেই তো!&#xA;&#xA;— ভয় পাইয়েন না বাবা, আমি চোর না।&#xA;&#xA;— আপনি বুঝলেন কী করে আমি ভয় পাচ্ছি?&#xA;&#xA;— আপনে আমারে দেইখ্যা যেইভাবে ব্যাগটারে ধরছেন, মনে হইতাছে ব্যাগের ভিত্তে বৌমার সব সোনাদানা নিয়া আসছেন।&#xA;&#xA;রাশেদ ব্যাগটা একটু ঢিলে করল। ভেতরে আছে একটা টিফিন বক্স আর আধখাওয়া পানির বোতল।&#xA;&#xA;— দশটা টেকা দেন বাবা।&#xA;&#xA;রাশেদ মানিব্যাগ খুলে দশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিলেন। বুড়ো সেটা না নিয়ে মাথা নাড়লেন।&#xA;&#xA;— না বাবা, বিশ টেকা দেন।&#xA;&#xA;— কিন্তু আপনি না মাত্র বললেন দশ টাকার কথা!&#xA;&#xA;— কইছিলাম। কিন্তু আপনে আমারে দেইখা যেই ভয় পাইছেন তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে আরও দশ টেকা আপনার কাছে আমি প্রাপ্য।&#xA;&#xA;রাশেদ হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। লোকটা রাশেদের এই অবস্থা দেখে হেসে ফেলল। তার হাসিতে আক্রান্ত হয়ে রাসেদের মুখেও হাসি ফুটে উঠলো।&#xA;&#xA;— আপনি ভিক্ষা করেন, নাকি ব্যবসা?&#xA;&#xA;— পরিস্থিতি বুইজ্জা দুইটাই করি।&#xA;&#xA;লোকটার নাম করিম মিয়া। এই স্টেশনই তাঁর ঠিকানা। রাশেদ তাকে বিশ টাকা দিলো। করিম মিয়া নোটটা ভাঁজ করে চাদরের ভেতর চালান করে দিলো। সেই হাতের ক্ষিপ্রতা দেখলে যে কোনো ম্যাজিশিয়ান লজ্জা পেত।&#xA;&#xA;— একটা কথা বাবা, আপনার কি টেরেন মিস হইসে?&#xA;&#xA;— আপনি বুঝলেন কী করে? জ্যোতিষী নাকি?&#xA;&#xA;— না, আপনে পাঁচ মিনিটে এগারোবার ঘড়ি দেখছেন, আমি ঐখান থাইক্যা গুনছি। আর আপনের কপালে লেখা দেখতেছি, &#34;আইজ আমার বউ আমারে মাইরা ফেলবে&#34;।&#xA;&#xA;— এতটাই স্পষ্ট?&#xA;&#xA;— সাইনবোর্ডের মতো ফকফকা।&#xA;&#xA;করিম মিয়া পাশে এসে বসে পড়লো, যেন রাশেদ তাঁর বহুদিনের মক্কেল।&#xA;&#xA;— আপনার ইস্তিরি ফোন করছে?&#xA;&#xA;— পাঁচবার।&#xA;&#xA;— ধরছেন?&#xA;&#xA;— প্রথম দুইবার ধরেছিলাম।&#xA;&#xA;— হেরপর?&#xA;&#xA;— তারপর আর সাহস হয়নি।&#xA;&#xA;— সত্য কথা কইলেই তো হয়।&#xA;&#xA;— এখন সত্যি বললে বিপদ বাড়বে।&#xA;&#xA;— আর মিথ্যা কইলে?&#xA;&#xA;— সেটা পরে সামলানো যাবে।&#xA;&#xA;করিম মিয়া গম্ভীর মুখে মাথা দুলিয়ে বললেন, &#34;সংসার বড় কঠিন জায়গা বাবা। এইখানে সত্যও বিপদ, আবার মিথ্যাও বিপদ। সবচাইতে নিরাপদ হইলো টেরেন মিস না করা।&#34;&#xA;&#xA;— সেটা এখন বলে লাভ কী!&#xA;&#xA;— সেইটাও হক কথা।&#xA;&#xA;তখনই লাউডস্পিকারে ভাঙা গলায় ঘোষণা হলো, &#34;পরবর্তী ট্রেন......&#34; তারপর খড়খড় শব্দ করে সব চুপ।&#xA;&#xA;— এই মাইকটা আমার চেয়েও বুড়া, বললেন করিম মিয়া।&#xA;&#xA;— ট্রেন আসতে এখনও বিশ মিনিটের মতো বাকি।&#xA;&#xA;— তাইলে চলেন চা খাই।&#xA;&#xA;— এত রাতে চা? ঘুম আসবে না তো।&#xA;&#xA;— বাড়ি গিয়া আপনে ঘুমানের সুযোগ পাইবেন বইলা মনে হয়?&#xA;&#xA;রাশেদ এবার শব্দ করে হেসে ফেললেন। অনেকদিন পর এভাবে হাসলেন।&#xA;&#xA;চায়ের দোকানি তখন ঝাঁপ প্রায় নামিয়ে ফেলেছে। করিম মিয়া হাঁক দিলেন, &#34;ঐ ছ্যাড়া দুই কাপ দে, একটা আমারে, একটা ভদ্দরলোকেরে&#34;।&#xA;&#xA;— আমি চা খাব না।&#xA;&#xA;— খান বাবা। আপনের চেহারা দেইখা মনে হইতাছে যে নিজের ভুলের লাইগা আপনে এহনই একটা কমিটি বানাইবেন, হেরপর হেরা আপনের এই ভুল শুধরাইয়া দিবো; এত চিন্তা বাদ দিয়া একটা চা খান আমার লগে।&#xA;&#xA;কিছুক্ষন বাদেই চা চলে আসলো। দারুণ গরম চা, আদার গন্ধ। রাশেদ এক চুমুক দিয়ে অবাক হলো। এত রাতে, এমন জায়গায়, এত ভালো চা!&#xA;&#xA;চা খেতে খেতে করিম মিয়া নিজের গল্প বললেন। একসময় রেলের কুলি ছিলেন। সংসার ছিল, ছেলেমেয়ে হলো, তারপর সবাই যে যার পথে চলে গেল।&#xA;&#xA;— আপনার বাড়ি নেই?&#xA;&#xA;করিম মিয়া রেল লাইনের দিকে তাকিয়ে একটু চুপ করে রইলেন।&#xA;&#xA;— ছিল একসময়, এহন এই ইস্টিশনই আমার বাড়ি।&#xA;&#xA;রাশেদ কী বলবে ভেবে পেলো না। কিন্তু করিম মিয়া নিজেই হেসে উঠলো।&#xA;&#xA;— তয় একটা সুবিধা আছে, এই বাড়ির কোন ভাড়া দেওন লাগে না।&#xA;&#xA;দুজনেই হাসলো। রাশেদের ভেতরের ভার খানিকটা নেমে গেল।&#xA;&#xA;হঠাৎ করিম মিয়া বলল, &#34;এইবার বৌমারে একটা ফোন দেন।&#34;&#xA;&#xA;— এখন?&#xA;&#xA;— হ, এহনই। ফোন দিয়া কইবেন যে আপনে টেরেন মিস করেছেন।&#xA;&#xA;— তারপর?&#xA;&#xA;— হেরপর চুপ থাকবেন।&#xA;&#xA;— যদি জিজ্ঞেস করে, কীভাবে মিস করলাম?&#xA;&#xA;— কইবেন, পক‍্কিতির নিয়ম।&#xA;&#xA;রাশেদ কাঁপা হাতে ফোন করলো। প্রথম রিংয়েই ওপাশ থেকে গম্ভীর গলা, &#34;কোথায়?&#34;&#xA;&#xA;— স্টেশনে।&#xA;&#xA;— ট্রেন?&#xA;&#xA;— মিস করেছি।&#xA;&#xA;নীরবতা। রাশেদ চোখ বন্ধ করে ফেললো। মনে হলো এই নীরবতার মধ্যেই তাঁর ভাগ্য ঝুলছে। তারপর মিতু বলল, &#34;তুমি একটা অদ্ভুত মানুষ&#34;।&#xA;&#xA;— জানি।&#xA;&#xA;— কতক্ষণ লাগবে?&#xA;&#xA;— দশ-পনেরো মিনিট।&#xA;&#xA;— ঠিক আছে, সাবধানে এসো।&#xA;&#xA;ফোন কেটে গেল। রাশেদ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন ওটা এইমাত্র আলাদিনের চেরাগের মতো কাজ করেছে।&#xA;&#xA;— দেখলেন? সত্য কইলেই বউ মারে না।&#xA;&#xA;— আপনি এত জানেন কী করে?&#xA;&#xA;— চল্লিশ বছর সংসার করছি না!&#xA;&#xA;— করেছিলেন? আর এখন?&#xA;&#xA;— ইস্তিরি মারা গেছে।&#xA;&#xA;করিম মিয়া একটু থামলেন। তারপর হালকা গলায় বললেন, &#34;অহন ঐ বেডির বকবকানিডাই মনে পরে&#34;।&#xA;&#xA;রাশেদ আর কিছু বললেন না।&#xA;&#xA;দূরে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল। করিম মিয়া উঠে দাঁড়ালেন।&#xA;&#xA;— আফনের টেরেন।&#xA;&#xA;রাশেদ পকেট থেকে কিছু টাকা বের করতে গেলো, তার আগেই করিম মিয়া হাত তুলে থামিয়ে দিলো।&#xA;&#xA;— রাহেন। আইজ আফনে আমার লগে বইয়া চা খাইছেন, এইডাই অনেক। টেকাটা দিয়া বৌমার লইগা সুন্দর দেইহা ফুল কিন্না লইয়া যাইয়েন।&#xA;&#xA;— ফুল?&#xA;&#xA;— হ, টেরেন মিস করার ক্ষতিপূরণ, সংসারের ক্ষতিপূরণ।&#xA;&#xA;রাশেদ হাসতে হাসতে জিজ্ঞাস করলো, &#34;আপনি আসলে ভিক্ষুক না, উপদেষ্টা?&#34;&#xA;&#xA;— পরিস্থিতি বুইজ্জা দুইটাই।&#xA;&#xA;ট্রেন ছেড়ে দিল। জানালার পাশে বসে রাশেদ দেখলো, করিম মিয়া প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন, যেন খুব আত্নীয় কেউ বিদায় জানাচ্ছে। ট্রেন চলতে চলতে স্টেশনটা একসময় ছোট হতে হতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো।&#xA;&#xA;রাশেদ মোবাইলে মিতুকে লিখলো, &#34;ট্রেন মিস করে এক দারুণ মানুষের দেখা পেলাম। বাড়ি গিয়ে সব বলব। আর শোনো, ফুল নিয়ে আসছি।&#34;&#xA;&#xA;কিছুক্ষণ পর উত্তর এল: &#34;ফুল? তুমি? কী করেছ সত্যি করে বলো!&#34;&#xA;&#xA;রাশেদ ফোনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কিছু কিছু ভালো কাজের পরেও সন্দেহ থেকে যায়, সেটাই হয়তো সংসারের নিয়ম।&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;]]&gt;</description>
      <content:encoded><![CDATA[<p><img src="https://i.postimg.cc/vTkZHK3w/PI-Web-2026-10-01-Story-Train-Miss-Korar-Golpo.jpg" alt="ট্রেন মিস করার গল্প..."></p>

<p>রাত এগারোটা পনেরো। রাশেদ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে, আর তাঁর মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে এইমাত্র সে জানতে পেরেছে যে, পৃথিবীর সব ট্রেন আসলে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করে।</p>

<p>পাঁচ মিনিট আগে তার ট্রেনটা চলে গেছে। রাশেদ দৌড়ে এসেছিল ঠিকই, তবে তাঁর দৌড়ের গতি ছিল সরকারি ফাইলের মতো। ট্রেন তাঁর জন্য দাঁড়ায়নি, শুধু শেষ বগির লাল বাতিটা একবার চোখ টিপে বিদায় জানিয়েছে।

মোবাইলের স্ক্রিনে মিতুর পাঁচটা মিসড কল লেখা ভাসছে। ষষ্ঠবারের মতো ফোন বাজতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল “মিতু ❤️”। রাশেদ অনেকক্ষণ সেই হার্ট চিহ্নটার দিকে তাকিয়ে রইলো। নামটা সেভ করার সময় ইমোজিটা সে নিজেই দিয়েছিলো। এখন মনে হচ্ছে ওটা হার্ট না, ওটা বিস্ফোরকের চিহ্ন!</p>

<p>ফোনটা সে পকেটে চালান করে দিলো। বিপদের সময় ফোন ধরার চেয়ে ফোন না ধরাই নিরাপদ। এটা সে বিয়ের তৃতীয় বছরে শিখেছে, তার জন্য অবশ্য দামটা দিতে হয়েছে এক জোড়া কানের দুল দিয়ে।</p>

<p>চারপাশ ফাঁকা। চায়ের দোকানি ঝাঁপ নামানোর তোড়জোড় করছে। বাতাসে চা, ধোঁয়া আর লোহার গন্ধ। আর রাশেদের মাথায় একের পর এক দুশ্চিন্তা। প্রথমেই মনে পড়লো ছিনতাইয়ের কথা, আর সেটা মনে হতেই আপনা-আপনি হাত চলে গেলো মানিব্যাগের দিকে, তারপর মনে হলো মোবাইলটাও সাথেই আছে, এর সাথে জীবনবীমার পলিসির মেয়াদ কবে শেষ সেটাও মনে পড়ে গেলো। ভয় পাওয়া মন মনে হয় এমনই করে।</p>

<p>ঠিক তখনই সে দেখলো লোকটাকে। প্ল্যাটফর্মের ওপাশে এক বুড়ো মতো মানুষ। গায়ে ময়লা চাদর, মাথায় উশখো-খুশকো কাঁচাপাঁকা চুল, পাশে কাপড়ের থলে। লোকটা একদৃষ্টে রাশেদের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ পিটপিট করছে না। সাপ আর ভূতের পরে এভাবে তাকাতে পারে শুধু পাওনাদার।</p>

<p>বুড়ো ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। রাশেদের হাতের ব্যাগ আপনা-আপনি বুকের সঙ্গে সেঁটে গেল। বুড়ো এক পা, দুই পা, তিন পা করে এগিয়ে এল। রাশেদ মনে কলমা পড়া শুরু করলেন, তবে তাড়াহুড়োয় মাঝখানে ঢুকে গেল কুলহু আল্লাহ সূরা।</p>

<p>— বাবা...</p>

<p>— জি?</p>

<p>— কয়টা টেকা দিবেন?</p>

<p>রাশেদের ভয় নামল, কিন্তু নামার সময় মনে হলো ধপ করে এসে বসল অন্য একটা ভয়ের কাঁধে। ছিনতাইকারী হলে অন্তত বোঝা যেত পরিস্থিতিটা কী। কিন্তু ভদ্রভাবে টাকা চাইলে কী করতে হয়, সেটা তো কোনো স্কুলে শেখায়নি। ব্যাটার অন্য কোন মতলব নেই তো!</p>

<p>— ভয় পাইয়েন না বাবা, আমি চোর না।</p>

<p>— আপনি বুঝলেন কী করে আমি ভয় পাচ্ছি?</p>

<p>— আপনে আমারে দেইখ্যা যেইভাবে ব্যাগটারে ধরছেন, মনে হইতাছে ব্যাগের ভিত্তে বৌমার সব সোনাদানা নিয়া আসছেন।</p>

<p>রাশেদ ব্যাগটা একটু ঢিলে করল। ভেতরে আছে একটা টিফিন বক্স আর আধখাওয়া পানির বোতল।</p>

<p>— দশটা টেকা দেন বাবা।</p>

<p>রাশেদ মানিব্যাগ খুলে দশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিলেন। বুড়ো সেটা না নিয়ে মাথা নাড়লেন।</p>

<p>— না বাবা, বিশ টেকা দেন।</p>

<p>— কিন্তু আপনি না মাত্র বললেন দশ টাকার কথা!</p>

<p>— কইছিলাম। কিন্তু আপনে আমারে দেইখা যেই ভয় পাইছেন তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে আরও দশ টেকা আপনার কাছে আমি প্রাপ্য।</p>

<p>রাশেদ হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। লোকটা রাশেদের এই অবস্থা দেখে হেসে ফেলল। তার হাসিতে আক্রান্ত হয়ে রাসেদের মুখেও হাসি ফুটে উঠলো।</p>

<p>— আপনি ভিক্ষা করেন, নাকি ব্যবসা?</p>

<p>— পরিস্থিতি বুইজ্জা দুইটাই করি।</p>

<p>লোকটার নাম করিম মিয়া। এই স্টেশনই তাঁর ঠিকানা। রাশেদ তাকে বিশ টাকা দিলো। করিম মিয়া নোটটা ভাঁজ করে চাদরের ভেতর চালান করে দিলো। সেই হাতের ক্ষিপ্রতা দেখলে যে কোনো ম্যাজিশিয়ান লজ্জা পেত।</p>

<p>— একটা কথা বাবা, আপনার কি টেরেন মিস হইসে?</p>

<p>— আপনি বুঝলেন কী করে? জ্যোতিষী নাকি?</p>

<p>— না, আপনে পাঁচ মিনিটে এগারোবার ঘড়ি দেখছেন, আমি ঐখান থাইক্যা গুনছি। আর আপনের কপালে লেখা দেখতেছি, “আইজ আমার বউ আমারে মাইরা ফেলবে”।</p>

<p>— এতটাই স্পষ্ট?</p>

<p>— সাইনবোর্ডের মতো ফকফকা।</p>

<p>করিম মিয়া পাশে এসে বসে পড়লো, যেন রাশেদ তাঁর বহুদিনের মক্কেল।</p>

<p>— আপনার ইস্তিরি ফোন করছে?</p>

<p>— পাঁচবার।</p>

<p>— ধরছেন?</p>

<p>— প্রথম দুইবার ধরেছিলাম।</p>

<p>— হেরপর?</p>

<p>— তারপর আর সাহস হয়নি।</p>

<p>— সত্য কথা কইলেই তো হয়।</p>

<p>— এখন সত্যি বললে বিপদ বাড়বে।</p>

<p>— আর মিথ্যা কইলে?</p>

<p>— সেটা পরে সামলানো যাবে।</p>

<p>করিম মিয়া গম্ভীর মুখে মাথা দুলিয়ে বললেন, “সংসার বড় কঠিন জায়গা বাবা। এইখানে সত্যও বিপদ, আবার মিথ্যাও বিপদ। সবচাইতে নিরাপদ হইলো টেরেন মিস না করা।”</p>

<p>— সেটা এখন বলে লাভ কী!</p>

<p>— সেইটাও হক কথা।</p>

<p>তখনই লাউডস্পিকারে ভাঙা গলায় ঘোষণা হলো, “পরবর্তী ট্রেন......” তারপর খড়খড় শব্দ করে সব চুপ।</p>

<p>— এই মাইকটা আমার চেয়েও বুড়া, বললেন করিম মিয়া।</p>

<p>— ট্রেন আসতে এখনও বিশ মিনিটের মতো বাকি।</p>

<p>— তাইলে চলেন চা খাই।</p>

<p>— এত রাতে চা? ঘুম আসবে না তো।</p>

<p>— বাড়ি গিয়া আপনে ঘুমানের সুযোগ পাইবেন বইলা মনে হয়?</p>

<p>রাশেদ এবার শব্দ করে হেসে ফেললেন। অনেকদিন পর এভাবে হাসলেন।</p>

<p>চায়ের দোকানি তখন ঝাঁপ প্রায় নামিয়ে ফেলেছে। করিম মিয়া হাঁক দিলেন, “ঐ ছ্যাড়া দুই কাপ দে, একটা আমারে, একটা ভদ্দরলোকেরে”।</p>

<p>— আমি চা খাব না।</p>

<p>— খান বাবা। আপনের চেহারা দেইখা মনে হইতাছে যে নিজের ভুলের লাইগা আপনে এহনই একটা কমিটি বানাইবেন, হেরপর হেরা আপনের এই ভুল শুধরাইয়া দিবো; এত চিন্তা বাদ দিয়া একটা চা খান আমার লগে।</p>

<p>কিছুক্ষন বাদেই চা চলে আসলো। দারুণ গরম চা, আদার গন্ধ। রাশেদ এক চুমুক দিয়ে অবাক হলো। এত রাতে, এমন জায়গায়, এত ভালো চা!</p>

<p>চা খেতে খেতে করিম মিয়া নিজের গল্প বললেন। একসময় রেলের কুলি ছিলেন। সংসার ছিল, ছেলেমেয়ে হলো, তারপর সবাই যে যার পথে চলে গেল।</p>

<p>— আপনার বাড়ি নেই?</p>

<p>করিম মিয়া রেল লাইনের দিকে তাকিয়ে একটু চুপ করে রইলেন।</p>

<p>— ছিল একসময়, এহন এই ইস্টিশনই আমার বাড়ি।</p>

<p>রাশেদ কী বলবে ভেবে পেলো না। কিন্তু করিম মিয়া নিজেই হেসে উঠলো।</p>

<p>— তয় একটা সুবিধা আছে, এই বাড়ির কোন ভাড়া দেওন লাগে না।</p>

<p>দুজনেই হাসলো। রাশেদের ভেতরের ভার খানিকটা নেমে গেল।</p>

<p>হঠাৎ করিম মিয়া বলল, “এইবার বৌমারে একটা ফোন দেন।”</p>

<p>— এখন?</p>

<p>— হ, এহনই। ফোন দিয়া কইবেন যে আপনে টেরেন মিস করেছেন।</p>

<p>— তারপর?</p>

<p>— হেরপর চুপ থাকবেন।</p>

<p>— যদি জিজ্ঞেস করে, কীভাবে মিস করলাম?</p>

<p>— কইবেন, পক‍্কিতির নিয়ম।</p>

<p>রাশেদ কাঁপা হাতে ফোন করলো। প্রথম রিংয়েই ওপাশ থেকে গম্ভীর গলা, “কোথায়?”</p>

<p>— স্টেশনে।</p>

<p>— ট্রেন?</p>

<p>— মিস করেছি।</p>

<p>নীরবতা। রাশেদ চোখ বন্ধ করে ফেললো। মনে হলো এই নীরবতার মধ্যেই তাঁর ভাগ্য ঝুলছে। তারপর মিতু বলল, “তুমি একটা অদ্ভুত মানুষ”।</p>

<p>— জানি।</p>

<p>— কতক্ষণ লাগবে?</p>

<p>— দশ-পনেরো মিনিট।</p>

<p>— ঠিক আছে, সাবধানে এসো।</p>

<p>ফোন কেটে গেল। রাশেদ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন ওটা এইমাত্র আলাদিনের চেরাগের মতো কাজ করেছে।</p>

<p>— দেখলেন? সত্য কইলেই বউ মারে না।</p>

<p>— আপনি এত জানেন কী করে?</p>

<p>— চল্লিশ বছর সংসার করছি না!</p>

<p>— করেছিলেন? আর এখন?</p>

<p>— ইস্তিরি মারা গেছে।</p>

<p>করিম মিয়া একটু থামলেন। তারপর হালকা গলায় বললেন, “অহন ঐ বেডির বকবকানিডাই মনে পরে”।</p>

<p>রাশেদ আর কিছু বললেন না।</p>

<p>দূরে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল। করিম মিয়া উঠে দাঁড়ালেন।</p>

<p>— আফনের টেরেন।</p>

<p>রাশেদ পকেট থেকে কিছু টাকা বের করতে গেলো, তার আগেই করিম মিয়া হাত তুলে থামিয়ে দিলো।</p>

<p>— রাহেন। আইজ আফনে আমার লগে বইয়া চা খাইছেন, এইডাই অনেক। টেকাটা দিয়া বৌমার লইগা সুন্দর দেইহা ফুল কিন্না লইয়া যাইয়েন।</p>

<p>— ফুল?</p>

<p>— হ, টেরেন মিস করার ক্ষতিপূরণ, সংসারের ক্ষতিপূরণ।</p>

<p>রাশেদ হাসতে হাসতে জিজ্ঞাস করলো, “আপনি আসলে ভিক্ষুক না, উপদেষ্টা?”</p>

<p>— পরিস্থিতি বুইজ্জা দুইটাই।</p>

<p>ট্রেন ছেড়ে দিল। জানালার পাশে বসে রাশেদ দেখলো, করিম মিয়া প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন, যেন খুব আত্নীয় কেউ বিদায় জানাচ্ছে। ট্রেন চলতে চলতে স্টেশনটা একসময় ছোট হতে হতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো।</p>

<p>রাশেদ মোবাইলে মিতুকে লিখলো, “ট্রেন মিস করে এক দারুণ মানুষের দেখা পেলাম। বাড়ি গিয়ে সব বলব। আর শোনো, ফুল নিয়ে আসছি।”</p>

<p>কিছুক্ষণ পর উত্তর এল: “ফুল? তুমি? কী করেছ সত্যি করে বলো!”</p>

<p>রাশেদ ফোনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কিছু কিছু ভালো কাজের পরেও সন্দেহ থেকে যায়, সেটাই হয়তো সংসারের নিয়ম।</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>
]]></content:encoded>
      <guid>https://infosec.press/lokmanus/story-train-miss-korar-golpo</guid>
      <pubDate>Thu, 01 Oct 2026 16:52:21 +0000</pubDate>
    </item>
    <item>
      <title>জানো কি প্রণয়িনী</title>
      <link>https://infosec.press/lokmanus/jaano-ki-prnny-inii</link>
      <description>&lt;![CDATA[জানো কি প্রণয়িনী&#xA;&#xA;জানো কি প্রণয়িনী,&#xA;যদি কোনো লেখক তোমার প্রেমে পড়ে,&#xA;তবে নশ্বর এই ধরায় তুমি হয়ে উঠবে অবিনশ্বর।&#xA;পাতায় পাতায় বাঁধা পড়বে তোমার নাম,&#xA;যুগ থেকে যুগান্তরে মানুষ পড়বে সেই কথা,&#xA;শত-সহস্র প্রেমিক খুঁজে পাবে তোমাতেই আপন ঠিকানা,&#xA;কালের গর্ভে তুমিই রবে চিরন্তন প্রণয়...&#xA;&#xA;জানো কি প্রণয়িনী,&#xA;যদি কোনো কবি তোমার প্রেমে পড়ে,&#xA;তবে তুমিই হবে তার প্রতিটি পঙক্তির প্রাণ।&#xA;শব্দে শব্দে গাঁথা হবে তোমার মুখের হাসি,&#xA;ছন্দে ছন্দে বাজবে তোমার নামের সুর,&#xA;মানুষ যখন ভালোবাসা খুঁজবে কবিতার বুকে,&#xA;সেখানে তোমাকেই খুঁজে পাবে বারবার...&#xA;!--more--&#xA;জানো কি প্রণয়িনী,&#xA;যদি কোনো দার্শনিক তোমার প্রেমে পড়ে,&#xA;তবে তুমি হয়ে উঠবে এক চিরন্তন প্রশ্ন, এক গভীর সত্য।&#xA;যুগে যুগে জ্ঞানীরা তোমাকে নিয়ে বসবে ভাবনায়,&#xA;তোমার অস্তিত্বে খুঁজে পাবে জীবনের মানে,&#xA;তর্কে-বিতর্কে, পাতায় পাতায় তুমিই রবে বিরাজমান,&#xA;তোমাকে বোঝাই হয়ে উঠবে জ্ঞানের সাধনা...&#xA;&#xA;জানো কি প্রণয়িনী,&#xA;যদি কোনো চিত্রশিল্পী তোমার প্রেমে পড়ে,&#xA;তবে তুমি হয়ে উঠবে ক্লিওপেট্রার চেয়েও রূপসী।&#xA;তুলির প্রতিটি টানে ফুটে উঠবে তোমার মায়া,&#xA;হাজারো চোখের তৃষ্ণা মেটাবে তোমারই ছবি,&#xA;কালের অন্তরে শত হৃদয় তোমাকে যতনে রাখবে বুকে,&#xA;তোমাকে দেখার প্রতীক্ষায় থমকে রবে সময়...&#xA;&#xA;জানো কি প্রণয়িনী,&#xA;যদি কোনো ভাস্কর তোমার প্রেমে পড়ে,&#xA;তবে তোমার ভাস্কর্য ঠাঁই পাবে দূর ফ্রান্সের কোনো গ্যালারিতে।&#xA;পাথরের বুকে খোদাই হবে তোমার আদল,&#xA;অপলক চোখে মানুষ ভুলে যাবে সময়ের হিসেব,&#xA;ঈর্ষায় প্রেমিকারা লুকাবে নিজেদের মুখ,&#xA;তুমিই হয়ে রবে যুগের এক অমলিন চিহ্ন...&#xA;&#xA;জানো কি প্রণয়িনী,&#xA;যদি কোনো সঙ্গীতশিল্পী তোমার প্রেমে পড়ে,&#xA;তবে তুমি হয়ে উঠবে এক অমর সুর, এক চিরসবুজ গান।&#xA;কণ্ঠে কণ্ঠে ঘুরবে তোমার নামের রেশ,&#xA;প্রতিটি গানের কলিতে বাজবে তোমারই ছন্দ,&#xA;রাত জাগা প্রেমিকেরা গুনগুনিয়ে গাইবে তোমাকে,&#xA;তুমিই হয়ে রবে ভালোবাসার নিজস্ব সুরলিপি...&#xA;&#xA;জানো কি প্রণয়িনী,&#xA;যদি কোনো স্থপতিবিদ তোমার প্রেমে পড়ে,&#xA;তবে ইট-পাথরের বুকে গড়ে উঠবে তোমার নামে এক অটল সৌধ।&#xA;দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসবে শুধু তোমাকে দেখতে,&#xA;প্রতিটি স্তম্ভে, প্রতিটি খিলানে লেখা থাকবে তোমার গল্প,&#xA;শতাব্দী পেরিয়েও দাঁড়িয়ে রবে সেই ভালোবাসার প্রতীক,&#xA;তুমিই হয়ে উঠবে এক স্থাপত্যের কিংবদন্তি...&#xA;&#xA;জানো কি প্রণয়িনী,&#xA;যদি কোনো ইতিহাসবিদ তোমার প্রেমে পড়ে,&#xA;তবে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হবে তোমার নাম।&#xA;আগামী প্রজন্ম পড়বে তোমার কথা মলাটবদ্ধ বইয়ের ভাঁজে,&#xA;সময়ের স্রোতে তুমি হবে না কখনো বিস্মৃত,&#xA;তোমাকে নিয়ে রচিত হবে কত শত অধ্যায়,&#xA;তুমিই হয়ে রবে ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য...&#xA;&#xA;অথচ দেখো, তোমার প্রেমেই পড়েছি আমি,&#xA;না আছে আমার লেখকের কলম, না কবির সেই ছন্দ,&#xA;না আছে দার্শনিকের জ্ঞান, না শিল্পীর নিপুণ তুলি,&#xA;না আছে ভাস্করের হাত, না সুরকারের কণ্ঠ,&#xA;না আছে স্থপতির নকশা, না ইতিহাসের সেই কলম-&#xA;যার ভরসায় তোমাকে যুগ থেকে যুগান্তরে পৌঁছে দিতে পারি।&#xA;আমি নিঃস্ব, আমি রিক্ত, নেই কোনো প্রতিভা কিংবা গুণ,&#xA;অথচ অবাক কাণ্ড দেখো- আমার হৃদয় ঠিকই তোমার প্রেমে পড়েছে...]]&gt;</description>
      <content:encoded><![CDATA[<p><img src="https://i.ibb.co/bM8QNY0y/PI-WEB-jano-ki-pronoyenee.jpg" alt="জানো কি প্রণয়িনী"></p>

<p>জানো কি প্রণয়িনী,
যদি কোনো লেখক তোমার প্রেমে পড়ে,
তবে নশ্বর এই ধরায় তুমি হয়ে উঠবে অবিনশ্বর।
পাতায় পাতায় বাঁধা পড়বে তোমার নাম,
যুগ থেকে যুগান্তরে মানুষ পড়বে সেই কথা,
শত-সহস্র প্রেমিক খুঁজে পাবে তোমাতেই আপন ঠিকানা,
কালের গর্ভে তুমিই রবে চিরন্তন প্রণয়...</p>

<p>জানো কি প্রণয়িনী,
যদি কোনো কবি তোমার প্রেমে পড়ে,
তবে তুমিই হবে তার প্রতিটি পঙক্তির প্রাণ।
শব্দে শব্দে গাঁথা হবে তোমার মুখের হাসি,
ছন্দে ছন্দে বাজবে তোমার নামের সুর,
মানুষ যখন ভালোবাসা খুঁজবে কবিতার বুকে,
সেখানে তোমাকেই খুঁজে পাবে বারবার...

জানো কি প্রণয়িনী,
যদি কোনো দার্শনিক তোমার প্রেমে পড়ে,
তবে তুমি হয়ে উঠবে এক চিরন্তন প্রশ্ন, এক গভীর সত্য।
যুগে যুগে জ্ঞানীরা তোমাকে নিয়ে বসবে ভাবনায়,
তোমার অস্তিত্বে খুঁজে পাবে জীবনের মানে,
তর্কে-বিতর্কে, পাতায় পাতায় তুমিই রবে বিরাজমান,
তোমাকে বোঝাই হয়ে উঠবে জ্ঞানের সাধনা...</p>

<p>জানো কি প্রণয়িনী,
যদি কোনো চিত্রশিল্পী তোমার প্রেমে পড়ে,
তবে তুমি হয়ে উঠবে ক্লিওপেট্রার চেয়েও রূপসী।
তুলির প্রতিটি টানে ফুটে উঠবে তোমার মায়া,
হাজারো চোখের তৃষ্ণা মেটাবে তোমারই ছবি,
কালের অন্তরে শত হৃদয় তোমাকে যতনে রাখবে বুকে,
তোমাকে দেখার প্রতীক্ষায় থমকে রবে সময়...</p>

<p>জানো কি প্রণয়িনী,
যদি কোনো ভাস্কর তোমার প্রেমে পড়ে,
তবে তোমার ভাস্কর্য ঠাঁই পাবে দূর ফ্রান্সের কোনো গ্যালারিতে।
পাথরের বুকে খোদাই হবে তোমার আদল,
অপলক চোখে মানুষ ভুলে যাবে সময়ের হিসেব,
ঈর্ষায় প্রেমিকারা লুকাবে নিজেদের মুখ,
তুমিই হয়ে রবে যুগের এক অমলিন চিহ্ন...</p>

<p>জানো কি প্রণয়িনী,
যদি কোনো সঙ্গীতশিল্পী তোমার প্রেমে পড়ে,
তবে তুমি হয়ে উঠবে এক অমর সুর, এক চিরসবুজ গান।
কণ্ঠে কণ্ঠে ঘুরবে তোমার নামের রেশ,
প্রতিটি গানের কলিতে বাজবে তোমারই ছন্দ,
রাত জাগা প্রেমিকেরা গুনগুনিয়ে গাইবে তোমাকে,
তুমিই হয়ে রবে ভালোবাসার নিজস্ব সুরলিপি...</p>

<p>জানো কি প্রণয়িনী,
যদি কোনো স্থপতিবিদ তোমার প্রেমে পড়ে,
তবে ইট-পাথরের বুকে গড়ে উঠবে তোমার নামে এক অটল সৌধ।
দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসবে শুধু তোমাকে দেখতে,
প্রতিটি স্তম্ভে, প্রতিটি খিলানে লেখা থাকবে তোমার গল্প,
শতাব্দী পেরিয়েও দাঁড়িয়ে রবে সেই ভালোবাসার প্রতীক,
তুমিই হয়ে উঠবে এক স্থাপত্যের কিংবদন্তি...</p>

<p>জানো কি প্রণয়িনী,
যদি কোনো ইতিহাসবিদ তোমার প্রেমে পড়ে,
তবে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হবে তোমার নাম।
আগামী প্রজন্ম পড়বে তোমার কথা মলাটবদ্ধ বইয়ের ভাঁজে,
সময়ের স্রোতে তুমি হবে না কখনো বিস্মৃত,
তোমাকে নিয়ে রচিত হবে কত শত অধ্যায়,
তুমিই হয়ে রবে ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য...</p>

<p>অথচ দেখো, তোমার প্রেমেই পড়েছি আমি,
না আছে আমার লেখকের কলম, না কবির সেই ছন্দ,
না আছে দার্শনিকের জ্ঞান, না শিল্পীর নিপুণ তুলি,
না আছে ভাস্করের হাত, না সুরকারের কণ্ঠ,
না আছে স্থপতির নকশা, না ইতিহাসের সেই কলম-
যার ভরসায় তোমাকে যুগ থেকে যুগান্তরে পৌঁছে দিতে পারি।
আমি নিঃস্ব, আমি রিক্ত, নেই কোনো প্রতিভা কিংবা গুণ,
অথচ অবাক কাণ্ড দেখো- আমার হৃদয় ঠিকই তোমার প্রেমে পড়েছে...</p>
]]></content:encoded>
      <guid>https://infosec.press/lokmanus/jaano-ki-prnny-inii</guid>
      <pubDate>Mon, 28 Sep 2026 18:00:00 +0000</pubDate>
    </item>
    <item>
      <title>প্রতিচ্ছায়া</title>
      <link>https://infosec.press/lokmanus/story-prticchaayaa</link>
      <description>&lt;![CDATA[গল্প-প্রতিচ্ছায়া&#xA;&#xA;সকালগুলো এই শহরে সাধারণত একটা নরম, ভেজা আলস্য নিয়ে শুরু হয়। কুয়াশা আর রোদের মাঝামাঝি একটা অনিশ্চিত সময়, যখন রাস্তার ধারের চায়ের দোকানগুলো সবে চুলা জ্বালায় আর রিকশার টুংটাং শব্দে ঘুম ভাঙে গোটা পাড়ার। সেদিন সকালটাও ঠিক তেমনই শুরু হয়েছিল, অন্তত প্রথম কয়েক মিনিট পর্যন্ত। জানালার পর্দা ফুঁড়ে যে আলো এসে পড়েছিল ঘরের মেঝেতে, তাতে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না। কিন্তু বাড়ির বাইরে পা রাখার পরই বাতাসের গন্ধটা কেমন বদলে গেল। ভেজা কাগজ আর কালির একটা তীব্র, প্রায় অস্বস্তিকর গন্ধ, আর তার সাথে যুক্ত হয়েছে কড়া লিকারের চায়ের একটা গন্ধ। আশেপাশে তাকাতেই বুঝলাম প্রতিটা দেয়ালে পোস্টার দিয়ে ছেয়ে গেছে।&#xA;!--more--&#xA;&#xA;আমি প্রথমে ভাবলাম এটা আরেকটা রাজনৈতিক প্রচারণা। এই শহরে এমন হয়- রাতারাতি দেয়াল ভরে যায় মুখের ছবিতে, স্লোগানে, প্রতিশ্রুতির ভারে ন্যুব্জ পোস্টারে। কিন্তু কাছে গিয়ে যখন সাদা কাগজের ওপর কালো হরফে লেখা শব্দটা পড়লাম, তখন বুকের ভেতর একটা অচেনা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। নিখোঁজ; শব্দটার নিচে একটা মুখ, আর সেই মুখটা আমারই, যদিও চেনা আয়নায় যে মুখ আমি প্রতিদিন দেখি তার চেয়ে যেন কিছুটা বেশি ক্লান্ত, চোখের নিচে যেন কিছুটা বেশি ছায়া। রাস্তার মানুষজন তখন নিজেদের ব্যস্ততায় হেঁটে যাচ্ছিল, কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না, অথচ দেয়াল থেকে আমারই চোখ দুটো আমাকে অনুসরণ করছিল, নিঃশব্দে, নিরন্তর।&#xA;&#xA;পোস্টারের নিচের দিকে একটা ফোন নম্বর ছাপা ছিল, এগারোটা অঙ্ক, যা আমি কখনো নিজের জীবনে দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না, অথচ চোখ বোলাতেই কোথাও একটা অচেনা পরিচিতির অনুভূতি খেলে গেল; ঠিক যেমন কোনো ভুলে যাওয়া গানের সুর হঠাৎ কানে বাজলে হয়। কাগজটা ছিঁড়ে হাতে নিয়ে আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, ভাবলাম হয়তো এটা কারও নিষ্ঠুর রসিকতা, কারও ফটোশপের কারিকুরি। কিন্তু ফোনটা পকেট থেকে বের করে সেই নম্বরে ডায়াল করতে করতে আমার আঙুল কাঁপছিল, যেন শরীর নিজেই জানত এই ফোন কলটা কোথাও একটা সীমারেখা পার করে দেবে যা আর কখনো পেছনে ফেরা যাবে না।&#xA;&#xA;তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশে একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এল, কাঁপা, সন্দিগ্ধ, তবু কোথাও যেন গভীর পরিচিত। আমি কিছু বলার আগেই বুঝলাম গলাটা কার। বছরের পর বছর ধরে যে গলা আমাকে সকালে ডেকে তুলত, রাতে ঘুম পাড়াত, সেই অতিপরিচিত গলা। কিন্তু সেই পরিচিতি স্বস্তি আনল না, বরং একটা অসম্ভবের দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল, কারণ যে মানুষটার গলা আমি শুনছিলাম, তাকে আমি নিজের হাতে মাটি দিয়ে এসেছিলাম তিন বছর আগে।&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;সারাদিন আমি অফিসে গেলাম না। ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে বসে রইলাম, দুপুরের আলো জানালা গলে মেঝেতে একটা লম্বাটে চৌকো আকার তৈরি করছিল, সেই আলো ধীরে ধীরে সরে সরে বিকেলের দিকে হেলে পড়ছিল, আর আমি সেই আলোর সরে যাওয়া দেখছিলাম যেন তাতেই লুকিয়ে আছে কোনো উত্তর। ফোনের কল-লিস্টে নম্বরটা তখনো জ্বলজ্বল করছিল, আমি বারবার সেটার দিকে তাকালাম, যেন তাকিয়ে থাকলেই সংখ্যাগুলো নিজেদের গোপন অর্থ বলে দেবে। শেষে মোবাইলের ব্রাউজারে গিয়ে নিজের নামটাই সার্চ বক্সে টাইপ করলাম, এক ধরনের মরিয়া কৌতূহল থেকে, যেন নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজছি ইন্টারনেটের অচেনা কোণে।&#xA;&#xA;প্রথম কয়েকটা ফলাফল ছিল একেবারে সাধারণ- পুরোনো একটা ফেসবুক প্রোফাইল, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই তালিকায় নাম, কোনো একটা চাকরির সাইটে অসম্পূর্ণ বায়োডাটা। কিন্তু তারপর একটা সংবাদ-শিরোনাম চোখে পড়ল, আর সেই মুহূর্তে ঘরের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘন হয়ে এল। প্রতিবেদনটা তিন বছর আগের, তারিখটা আজকের তারিখের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যাচ্ছিল, আর তাতে লেখা ছিল আমারই নাম, আমারই চেহারা, আমার ঠিকানা। একজন তরুণ প্রকৌশলীর রহস্যজনক অন্তর্ধানের বিবরণ, যার শেষ দেখা মিলেছিল শহরের পুরোনো নদীবন্দরের কাছে, রাতের অন্ধকারে, একা।&#xA;&#xA;আমি প্রতিবেদনের প্রতিটি লাইন পড়লাম, তারপর আবার পড়লাম, যেন বারবার পড়লে শব্দগুলো বদলে যাবে, অর্থ পালটে যাবে। জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছিল, আর সেই আধো-অন্ধকারে আমার নিজের প্রতিবিম্ব কাচের গায়ে ভেসে উঠল- স্বচ্ছ, কাঁপা, যেন একটা ভুলে যাওয়া স্মৃতির মতো। আমি উঠে দাঁড়ালাম, রাস্তার দিকে তাকালাম, আর দেখলাম উল্টো দিকের দেয়ালে আরেকটা পোস্টার সেঁটে দেওয়া হয়েছে, যেটা সকালে ছিল না। এবার ছবিতে আমি হাসছি, এমন একটা হাসি যা আমার মনে পড়ে না আমি কখনো হেসেছি বলে, অথচ মুখের প্রতিটি রেখা নিঃসন্দেহে আমারই।&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;রাত নামলে আমি রাফিকে ফোন করলাম, ভেবেছিলাম বন্ধুর গলা শুনলে অন্তত কিছুটা মাটির সংযোগ ফিরে পাব। ওর হাসি দিয়ে কথোপকথন শুরু হলো, স্বাভাবিক, নির্ভার, যেন এই দিনটার কোনো অস্বাভাবিকতাই স্পর্শ করেনি ওকে। কিন্তু যখন আমি পোস্টারের কথা বললাম, সংবাদের কথা বললাম, ওর গলার স্বর ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। হালকা রসিকতা থেকে সরে গিয়ে প্রথমে একটু সতর্ক, প্রায় ভীত আর শেষে নীরবতায়। ও জিজ্ঞেস করল- গত তিন বছর আমি কোথায় ছিলাম। প্রশ্নটা এতটাই সহজ ভঙ্গিতে করল যে প্রথমে বুঝতেই পারিনি ওর কণ্ঠে কতটা ভয় জমে আছে।&#xA;&#xA;আমি ওকে মনে করিয়ে দিলাম, গতকালই আমরা একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়েছি, অফিসের করিডোরে হেঁটেছি, চায়ের কাপ হাতে গল্প করেছি। ও দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে ধীরে বলল যে গত তিন বছরে আমি অফিসে পা রাখিনি, আমাদের শেষ কথোপকথন হয়েছিল ঠিক তিন বছর আগে, যেদিন আমি ওকে বলেছিলাম কাউকে অনুসরণ করছি, নদীবন্দরের দিকে যাচ্ছি। ও জানতে চেয়েছিল কাকে অনুসরণ করছি, আর আমি নাকি উত্তরে বলেছিলাম- &#39;নিজেকেই&#39;।&#xA;&#xA;সেই মুহূর্তে ফোনের ওপাশে রাফির নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না, আর আমার বুকের ভেতর একটা অচেনা শীতলতা ছড়িয়ে পড়ছিল, যেন কেউ ধীরে ধীরে আমার শরীর থেকে উষ্ণতা টেনে নিচ্ছে। রাফি শেষে খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল আমি আয়নার দিকে তাকিয়েছি কিনা। ওর জিজ্ঞাসাটা এতটাই অপ্রাসঙ্গিক শোনাল যে আমি হেসে ফেলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হাসিটা গলার কাছে আটকে গেল। কারণ ততক্ষণে আমার পা নিজে থেকেই বাথরুমের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে, যেন শরীরটা মনের চেয়ে আগেই জানত কী অপেক্ষা করছে সেখানে।&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি প্রথমে কিছুই অস্বাভাবিক দেখলাম না- সেই একই মুখ, একই ক্লান্ত চোখ, চুলের একই অবিন্যস্ত রেখা। কিন্তু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর একটা অদ্ভুত বিলম্ব চোখে পড়ল, খুব সূক্ষ্ম, প্রায় ধরা পড়ে না এমন- আমি হাত তুললাম, আর প্রতিবিম্ব যেন এক লহমা পরে হাত তুলল, একটা নিঃশ্বাসের সময়ের ব্যবধান, যা স্বাভাবিক আয়নার হওয়ার কথা নয়। আমি মাথা কাত করলাম, প্রতিবিম্বও করল, কিন্তু সেই বিলম্বটা রয়েই গেল, যেন কাচের ওপাশে কেউ আমাকে নিখুঁতভাবে নকল করার চেষ্টা করছে অথচ ঠিক সময়মতো পারছে না।&#xA;&#xA;আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে, আর তখনই দেখলাম প্রতিবিম্বের ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল, যা আমার মুখে ছিল না। সেই হাসি ধীরে ধীরে চওড়া হলো, আর তার চোখে এমন একটা তৃপ্তি ফুটে উঠল যা আমি নিজের মধ্যে কখনো অনুভব করিনি। আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম, বাথরুমের ঠান্ডা টাইলসের স্পর্শ পায়ের তলায় অনুভব করলাম, আর সেই মুহূর্তে আলো নিভে গেল, একেবারে হঠাৎ, যেন কেউ অন্ধকারের সুইচ টিপে দিয়েছে ঠিক আমার ভয়টা চরমে পৌঁছানোর অপেক্ষায় ছিল।&#xA;&#xA;অন্ধকারে আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, নিজের হৃৎস্পন্দনের শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না, আর তার মাঝেই মনে হলো, আয়নার ওপাশ থেকে কেউ একজন এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে, ধৈর্য ধরে, অপেক্ষায়, যেন সময়টা তারই পক্ষে কাজ করছে।&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;পরদিন সকালে থানায় গিয়ে আমি বুঝলাম কাগজের জগতেও আমি আর সেই মানুষ নই যা আমি ভাবতাম। দায়িত্বরত অফিসার আমার পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করলেন, তারপর জানালেন এই আইডি তিন বছর আগেই বাতিল হয়ে গেছে, ঠিক আমার নিখোঁজ হওয়ার নথিভুক্ত তারিখের কিছুদিন পর। আমি ঠিকানা বললাম, যেখানে গত চার বছর ধরে বাস করছি কিংবা আমি বাস করছি বলে আমার ধারণা। অফিসার শান্তভাবে ঠিকানাটা চেক করলেন, কাকে যেন একবার ফোনও করলেন, তারপর আমাকে জানালেন সেই ফ্ল্যাটের মালিকের ভাষ্যমতে জায়গাটা তিন বছর ধরে খালি পড়ে আছে, কোনো ভাড়াটিয়া নেই, কোনো আসবাবও নেই।&#xA;&#xA;কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার মনে হলো পুলিশ স্টেশনের বাতাস ভারী হয়ে আসছে, যেন প্রতিটি বাক্য আমার চারপাশের বাস্তবতাকে একটু একটু করে সরু করে দিচ্ছে। অফিসার যখন জিজ্ঞেস করলেন আমি সত্যিই সেই মানুষ কিনা যার নাম নথিতে লেখা, আমি উত্তর দিতে পারিনি, কারণ প্রশ্নটা এতদিন যতটা সহজ মনে হতো, এখন ঠিক ততটাই জটিল হয়ে উঠেছে। আমি বিব্রত হাসি দিয়ে অফিসারের রুম থেকে বের হয়ে আসলাম।&#xA;&#xA;বাড়ি ফেরার পথে আমি প্রতিটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে নিজের মুখ দেখলাম, প্রতিটি পোস্টারে আলাদা আলাদা তারিখ, আলাদা আলাদা বিবরণ, যেন তিন বছরের প্রতিটি দিন কেউ যত্ন করে লিপিবদ্ধ করে রেখেছে, অথচ সেই দিনগুলোর একটাও আমার নিজের স্মৃতিতে নেই।&#xA;&#xA;ফ্ল্যাটে ফিরে দরজা খুলতেই বুঝলাম কিছু একটা সম্পূর্ণভাবে বদলে গেছে। কোন টেবিল নেই, বিছানা নেই, আমার চায়ের কাপ নেই, কোনো ব্যক্তিগত চিহ্ন নেই। শুধু দেয়ালে একটা আয়না ঝুলছে, যেটা আগে সেখানে ছিল বলে আমার মনে পড়ছে না। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই দেখলাম, ওপাশের ঘরটা আমার নিজের ঘরের মতোই সাজানো, টেবিলে ল্যাপটপ, পাশে চায়ের কাপ। আর সেই টেবিলে বসে আছে আরেকজন। হুবহু আমার মতো দেখতে আরেকজন আমি, মাথা নিচু করে কিছু লিখছি, নিবিষ্ট, নিশ্চিন্ত। সে মাথা তুলল, আমার দিকে তাকাল, তারপর একটা কাগজ তুলে ধরল কাচের ওপাশ থেকে, তাতে লেখা ছিল কয়েকটা শব্দ, যা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীরের সমস্ত উষ্ণতা যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেল।&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;সেই রাতে শহর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে জানলাম শহরের বাইরে যাওয়ার প্রধান সড়ক অজানা কারণে বন্ধ, সব বাস বাতিল, যাত্রীরা বিভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে। আমি একটা বেঞ্চে বসে পড়লাম, ক্লান্তি আর ভয়ের মিশ্র একটা অনুভূতি নিয়ে, আর তখনই পাশের দেয়ালে চোখ পড়ল সেই পরিচিত পোস্টারে। এবার কাছে গিয়ে দেখলাম শব্দগুলো বদলে গেছে- আগের নিখোঁজ শব্দটার জায়গায় এখন লেখা, &#34;সন্ধান পাওয়া গেছে&#34;। আর তার নিচে ছোট্ট একটা বাক্য যোগ হয়েছে, যা পড়ে বোঝার চেষ্টা করলাম ঠিক কী বোঝাতে চাওয়া হয়েছে, অথচ প্রতিবার পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থটা যেন হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছিল।&#xA;&#xA;আমি বেঞ্চে বসে রইলাম অনেকক্ষণ, শহরের আলো একে একে নিভে যাওয়া দেখলাম, আর ভাবলাম- যদি সত্যিই কাউকে খুঁজে পাওয়া গিয়ে থাকে, তাহলে সে কে? আর যে এখন এই বেঞ্চে বসে এসব ভাবছে, সে নিজে তবে কে?&#xA;&#xA;রাতের শেষ প্রহরে বাসস্ট্যান্ডের আলো টিমটিম করছিল, দূরে নদীবন্দরের দিক থেকে একটা শিস-এর মতো শব্দ ভেসে আসছিল, আর আমি বুঝতে পারলাম না সেই শব্দ কোনো ট্রেনের, নাকি কারও ডাকার আওয়াজ, নাকি শুধুই বাতাসের খেলা। যা নিশ্চিত ছিল তা কেবল এটুকু- শহর জেগে উঠলে আবার নতুন একটা পোস্টার দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে যাবে, নতুন একটা তারিখ নিয়ে, নতুন একটা গল্প নিয়ে, আর সেই গল্পের কেন্দ্রে থাকা মুখটা আমারই হবে কিনা, তা বলার সাধ্য আমার আর ছিল না।⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀]]&gt;</description>
      <content:encoded><![CDATA[<p><img src="https://i.postimg.cc/J75WP8N9/PI-WEB-2026-09-17-pa-rata-ca-cha-ya.jpg" alt="গল্প-প্রতিচ্ছায়া"></p>

<p>সকালগুলো এই শহরে সাধারণত একটা নরম, ভেজা আলস্য নিয়ে শুরু হয়। কুয়াশা আর রোদের মাঝামাঝি একটা অনিশ্চিত সময়, যখন রাস্তার ধারের চায়ের দোকানগুলো সবে চুলা জ্বালায় আর রিকশার টুংটাং শব্দে ঘুম ভাঙে গোটা পাড়ার। সেদিন সকালটাও ঠিক তেমনই শুরু হয়েছিল, অন্তত প্রথম কয়েক মিনিট পর্যন্ত। জানালার পর্দা ফুঁড়ে যে আলো এসে পড়েছিল ঘরের মেঝেতে, তাতে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না। কিন্তু বাড়ির বাইরে পা রাখার পরই বাতাসের গন্ধটা কেমন বদলে গেল। ভেজা কাগজ আর কালির একটা তীব্র, প্রায় অস্বস্তিকর গন্ধ, আর তার সাথে যুক্ত হয়েছে কড়া লিকারের চায়ের একটা গন্ধ। আশেপাশে তাকাতেই বুঝলাম প্রতিটা দেয়ালে পোস্টার দিয়ে ছেয়ে গেছে।
</p>

<p>আমি প্রথমে ভাবলাম এটা আরেকটা রাজনৈতিক প্রচারণা। এই শহরে এমন হয়- রাতারাতি দেয়াল ভরে যায় মুখের ছবিতে, স্লোগানে, প্রতিশ্রুতির ভারে ন্যুব্জ পোস্টারে। কিন্তু কাছে গিয়ে যখন সাদা কাগজের ওপর কালো হরফে লেখা শব্দটা পড়লাম, তখন বুকের ভেতর একটা অচেনা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। নিখোঁজ; শব্দটার নিচে একটা মুখ, আর সেই মুখটা আমারই, যদিও চেনা আয়নায় যে মুখ আমি প্রতিদিন দেখি তার চেয়ে যেন কিছুটা বেশি ক্লান্ত, চোখের নিচে যেন কিছুটা বেশি ছায়া। রাস্তার মানুষজন তখন নিজেদের ব্যস্ততায় হেঁটে যাচ্ছিল, কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না, অথচ দেয়াল থেকে আমারই চোখ দুটো আমাকে অনুসরণ করছিল, নিঃশব্দে, নিরন্তর।</p>

<p>পোস্টারের নিচের দিকে একটা ফোন নম্বর ছাপা ছিল, এগারোটা অঙ্ক, যা আমি কখনো নিজের জীবনে দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না, অথচ চোখ বোলাতেই কোথাও একটা অচেনা পরিচিতির অনুভূতি খেলে গেল; ঠিক যেমন কোনো ভুলে যাওয়া গানের সুর হঠাৎ কানে বাজলে হয়। কাগজটা ছিঁড়ে হাতে নিয়ে আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, ভাবলাম হয়তো এটা কারও নিষ্ঠুর রসিকতা, কারও ফটোশপের কারিকুরি। কিন্তু ফোনটা পকেট থেকে বের করে সেই নম্বরে ডায়াল করতে করতে আমার আঙুল কাঁপছিল, যেন শরীর নিজেই জানত এই ফোন কলটা কোথাও একটা সীমারেখা পার করে দেবে যা আর কখনো পেছনে ফেরা যাবে না।</p>

<p>তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশে একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এল, কাঁপা, সন্দিগ্ধ, তবু কোথাও যেন গভীর পরিচিত। আমি কিছু বলার আগেই বুঝলাম গলাটা কার। বছরের পর বছর ধরে যে গলা আমাকে সকালে ডেকে তুলত, রাতে ঘুম পাড়াত, সেই অতিপরিচিত গলা। কিন্তু সেই পরিচিতি স্বস্তি আনল না, বরং একটা অসম্ভবের দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল, কারণ যে মানুষটার গলা আমি শুনছিলাম, তাকে আমি নিজের হাতে মাটি দিয়ে এসেছিলাম তিন বছর আগে।
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
সারাদিন আমি অফিসে গেলাম না। ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে বসে রইলাম, দুপুরের আলো জানালা গলে মেঝেতে একটা লম্বাটে চৌকো আকার তৈরি করছিল, সেই আলো ধীরে ধীরে সরে সরে বিকেলের দিকে হেলে পড়ছিল, আর আমি সেই আলোর সরে যাওয়া দেখছিলাম যেন তাতেই লুকিয়ে আছে কোনো উত্তর। ফোনের কল-লিস্টে নম্বরটা তখনো জ্বলজ্বল করছিল, আমি বারবার সেটার দিকে তাকালাম, যেন তাকিয়ে থাকলেই সংখ্যাগুলো নিজেদের গোপন অর্থ বলে দেবে। শেষে মোবাইলের ব্রাউজারে গিয়ে নিজের নামটাই সার্চ বক্সে টাইপ করলাম, এক ধরনের মরিয়া কৌতূহল থেকে, যেন নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজছি ইন্টারনেটের অচেনা কোণে।</p>

<p>প্রথম কয়েকটা ফলাফল ছিল একেবারে সাধারণ- পুরোনো একটা ফেসবুক প্রোফাইল, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই তালিকায় নাম, কোনো একটা চাকরির সাইটে অসম্পূর্ণ বায়োডাটা। কিন্তু তারপর একটা সংবাদ-শিরোনাম চোখে পড়ল, আর সেই মুহূর্তে ঘরের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘন হয়ে এল। প্রতিবেদনটা তিন বছর আগের, তারিখটা আজকের তারিখের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যাচ্ছিল, আর তাতে লেখা ছিল আমারই নাম, আমারই চেহারা, আমার ঠিকানা। একজন তরুণ প্রকৌশলীর রহস্যজনক অন্তর্ধানের বিবরণ, যার শেষ দেখা মিলেছিল শহরের পুরোনো নদীবন্দরের কাছে, রাতের অন্ধকারে, একা।</p>

<p>আমি প্রতিবেদনের প্রতিটি লাইন পড়লাম, তারপর আবার পড়লাম, যেন বারবার পড়লে শব্দগুলো বদলে যাবে, অর্থ পালটে যাবে। জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছিল, আর সেই আধো-অন্ধকারে আমার নিজের প্রতিবিম্ব কাচের গায়ে ভেসে উঠল- স্বচ্ছ, কাঁপা, যেন একটা ভুলে যাওয়া স্মৃতির মতো। আমি উঠে দাঁড়ালাম, রাস্তার দিকে তাকালাম, আর দেখলাম উল্টো দিকের দেয়ালে আরেকটা পোস্টার সেঁটে দেওয়া হয়েছে, যেটা সকালে ছিল না। এবার ছবিতে আমি হাসছি, এমন একটা হাসি যা আমার মনে পড়ে না আমি কখনো হেসেছি বলে, অথচ মুখের প্রতিটি রেখা নিঃসন্দেহে আমারই।
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
রাত নামলে আমি রাফিকে ফোন করলাম, ভেবেছিলাম বন্ধুর গলা শুনলে অন্তত কিছুটা মাটির সংযোগ ফিরে পাব। ওর হাসি দিয়ে কথোপকথন শুরু হলো, স্বাভাবিক, নির্ভার, যেন এই দিনটার কোনো অস্বাভাবিকতাই স্পর্শ করেনি ওকে। কিন্তু যখন আমি পোস্টারের কথা বললাম, সংবাদের কথা বললাম, ওর গলার স্বর ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। হালকা রসিকতা থেকে সরে গিয়ে প্রথমে একটু সতর্ক, প্রায় ভীত আর শেষে নীরবতায়। ও জিজ্ঞেস করল- গত তিন বছর আমি কোথায় ছিলাম। প্রশ্নটা এতটাই সহজ ভঙ্গিতে করল যে প্রথমে বুঝতেই পারিনি ওর কণ্ঠে কতটা ভয় জমে আছে।</p>

<p>আমি ওকে মনে করিয়ে দিলাম, গতকালই আমরা একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়েছি, অফিসের করিডোরে হেঁটেছি, চায়ের কাপ হাতে গল্প করেছি। ও দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে ধীরে বলল যে গত তিন বছরে আমি অফিসে পা রাখিনি, আমাদের শেষ কথোপকথন হয়েছিল ঠিক তিন বছর আগে, যেদিন আমি ওকে বলেছিলাম কাউকে অনুসরণ করছি, নদীবন্দরের দিকে যাচ্ছি। ও জানতে চেয়েছিল কাকে অনুসরণ করছি, আর আমি নাকি উত্তরে বলেছিলাম- &#39;নিজেকেই&#39;।</p>

<p>সেই মুহূর্তে ফোনের ওপাশে রাফির নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না, আর আমার বুকের ভেতর একটা অচেনা শীতলতা ছড়িয়ে পড়ছিল, যেন কেউ ধীরে ধীরে আমার শরীর থেকে উষ্ণতা টেনে নিচ্ছে। রাফি শেষে খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল আমি আয়নার দিকে তাকিয়েছি কিনা। ওর জিজ্ঞাসাটা এতটাই অপ্রাসঙ্গিক শোনাল যে আমি হেসে ফেলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হাসিটা গলার কাছে আটকে গেল। কারণ ততক্ষণে আমার পা নিজে থেকেই বাথরুমের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে, যেন শরীরটা মনের চেয়ে আগেই জানত কী অপেক্ষা করছে সেখানে।
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি প্রথমে কিছুই অস্বাভাবিক দেখলাম না- সেই একই মুখ, একই ক্লান্ত চোখ, চুলের একই অবিন্যস্ত রেখা। কিন্তু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর একটা অদ্ভুত বিলম্ব চোখে পড়ল, খুব সূক্ষ্ম, প্রায় ধরা পড়ে না এমন- আমি হাত তুললাম, আর প্রতিবিম্ব যেন এক লহমা পরে হাত তুলল, একটা নিঃশ্বাসের সময়ের ব্যবধান, যা স্বাভাবিক আয়নার হওয়ার কথা নয়। আমি মাথা কাত করলাম, প্রতিবিম্বও করল, কিন্তু সেই বিলম্বটা রয়েই গেল, যেন কাচের ওপাশে কেউ আমাকে নিখুঁতভাবে নকল করার চেষ্টা করছে অথচ ঠিক সময়মতো পারছে না।</p>

<p>আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে, আর তখনই দেখলাম প্রতিবিম্বের ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল, যা আমার মুখে ছিল না। সেই হাসি ধীরে ধীরে চওড়া হলো, আর তার চোখে এমন একটা তৃপ্তি ফুটে উঠল যা আমি নিজের মধ্যে কখনো অনুভব করিনি। আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম, বাথরুমের ঠান্ডা টাইলসের স্পর্শ পায়ের তলায় অনুভব করলাম, আর সেই মুহূর্তে আলো নিভে গেল, একেবারে হঠাৎ, যেন কেউ অন্ধকারের সুইচ টিপে দিয়েছে ঠিক আমার ভয়টা চরমে পৌঁছানোর অপেক্ষায় ছিল।</p>

<p>অন্ধকারে আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, নিজের হৃৎস্পন্দনের শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না, আর তার মাঝেই মনে হলো, আয়নার ওপাশ থেকে কেউ একজন এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে, ধৈর্য ধরে, অপেক্ষায়, যেন সময়টা তারই পক্ষে কাজ করছে।
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
পরদিন সকালে থানায় গিয়ে আমি বুঝলাম কাগজের জগতেও আমি আর সেই মানুষ নই যা আমি ভাবতাম। দায়িত্বরত অফিসার আমার পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করলেন, তারপর জানালেন এই আইডি তিন বছর আগেই বাতিল হয়ে গেছে, ঠিক আমার নিখোঁজ হওয়ার নথিভুক্ত তারিখের কিছুদিন পর। আমি ঠিকানা বললাম, যেখানে গত চার বছর ধরে বাস করছি কিংবা আমি বাস করছি বলে আমার ধারণা। অফিসার শান্তভাবে ঠিকানাটা চেক করলেন, কাকে যেন একবার ফোনও করলেন, তারপর আমাকে জানালেন সেই ফ্ল্যাটের মালিকের ভাষ্যমতে জায়গাটা তিন বছর ধরে খালি পড়ে আছে, কোনো ভাড়াটিয়া নেই, কোনো আসবাবও নেই।</p>

<p>কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার মনে হলো পুলিশ স্টেশনের বাতাস ভারী হয়ে আসছে, যেন প্রতিটি বাক্য আমার চারপাশের বাস্তবতাকে একটু একটু করে সরু করে দিচ্ছে। অফিসার যখন জিজ্ঞেস করলেন আমি সত্যিই সেই মানুষ কিনা যার নাম নথিতে লেখা, আমি উত্তর দিতে পারিনি, কারণ প্রশ্নটা এতদিন যতটা সহজ মনে হতো, এখন ঠিক ততটাই জটিল হয়ে উঠেছে। আমি বিব্রত হাসি দিয়ে অফিসারের রুম থেকে বের হয়ে আসলাম।</p>

<p>বাড়ি ফেরার পথে আমি প্রতিটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে নিজের মুখ দেখলাম, প্রতিটি পোস্টারে আলাদা আলাদা তারিখ, আলাদা আলাদা বিবরণ, যেন তিন বছরের প্রতিটি দিন কেউ যত্ন করে লিপিবদ্ধ করে রেখেছে, অথচ সেই দিনগুলোর একটাও আমার নিজের স্মৃতিতে নেই।</p>

<p>ফ্ল্যাটে ফিরে দরজা খুলতেই বুঝলাম কিছু একটা সম্পূর্ণভাবে বদলে গেছে। কোন টেবিল নেই, বিছানা নেই, আমার চায়ের কাপ নেই, কোনো ব্যক্তিগত চিহ্ন নেই। শুধু দেয়ালে একটা আয়না ঝুলছে, যেটা আগে সেখানে ছিল বলে আমার মনে পড়ছে না। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই দেখলাম, ওপাশের ঘরটা আমার নিজের ঘরের মতোই সাজানো, টেবিলে ল্যাপটপ, পাশে চায়ের কাপ। আর সেই টেবিলে বসে আছে আরেকজন। হুবহু আমার মতো দেখতে আরেকজন আমি, মাথা নিচু করে কিছু লিখছি, নিবিষ্ট, নিশ্চিন্ত। সে মাথা তুলল, আমার দিকে তাকাল, তারপর একটা কাগজ তুলে ধরল কাচের ওপাশ থেকে, তাতে লেখা ছিল কয়েকটা শব্দ, যা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীরের সমস্ত উষ্ণতা যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেল।
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
সেই রাতে শহর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে জানলাম শহরের বাইরে যাওয়ার প্রধান সড়ক অজানা কারণে বন্ধ, সব বাস বাতিল, যাত্রীরা বিভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে। আমি একটা বেঞ্চে বসে পড়লাম, ক্লান্তি আর ভয়ের মিশ্র একটা অনুভূতি নিয়ে, আর তখনই পাশের দেয়ালে চোখ পড়ল সেই পরিচিত পোস্টারে। এবার কাছে গিয়ে দেখলাম শব্দগুলো বদলে গেছে- আগের নিখোঁজ শব্দটার জায়গায় এখন লেখা, “সন্ধান পাওয়া গেছে”। আর তার নিচে ছোট্ট একটা বাক্য যোগ হয়েছে, যা পড়ে বোঝার চেষ্টা করলাম ঠিক কী বোঝাতে চাওয়া হয়েছে, অথচ প্রতিবার পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থটা যেন হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছিল।</p>

<p>আমি বেঞ্চে বসে রইলাম অনেকক্ষণ, শহরের আলো একে একে নিভে যাওয়া দেখলাম, আর ভাবলাম- যদি সত্যিই কাউকে খুঁজে পাওয়া গিয়ে থাকে, তাহলে সে কে? আর যে এখন এই বেঞ্চে বসে এসব ভাবছে, সে নিজে তবে কে?</p>

<p>রাতের শেষ প্রহরে বাসস্ট্যান্ডের আলো টিমটিম করছিল, দূরে নদীবন্দরের দিক থেকে একটা শিস-এর মতো শব্দ ভেসে আসছিল, আর আমি বুঝতে পারলাম না সেই শব্দ কোনো ট্রেনের, নাকি কারও ডাকার আওয়াজ, নাকি শুধুই বাতাসের খেলা। যা নিশ্চিত ছিল তা কেবল এটুকু- শহর জেগে উঠলে আবার নতুন একটা পোস্টার দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে যাবে, নতুন একটা তারিখ নিয়ে, নতুন একটা গল্প নিয়ে, আর সেই গল্পের কেন্দ্রে থাকা মুখটা আমারই হবে কিনা, তা বলার সাধ্য আমার আর ছিল না।⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>
]]></content:encoded>
      <guid>https://infosec.press/lokmanus/story-prticchaayaa</guid>
      <pubDate>Thu, 17 Sep 2026 11:04:02 +0000</pubDate>
    </item>
    <item>
      <title>মৃত পায়রার জয়</title>
      <link>https://infosec.press/lokmanus/mrt-paay-raar-jy</link>
      <description>&lt;![CDATA[মৃত পায়রার জয়&#xA;&#xA;একটা হাত উঠে আছে আকাশের দিকে। কালো, শক্ত, বিজয়ের ভঙ্গিতে দুটো আঙুল ছুঁয়ে গেছে শূন্যতাকে। সেই আঙুলের বাঁধনে গোঁজা একটা সাদা পায়রা। দূর থেকে দেখলে বুকটা একবার নেচে ওঠে- আহা, শান্তি এসেছে বুঝি! যুদ্ধ থেমেছে, রক্ত থেমেছে, কেউ একজন হাতে তুলে নিয়েছে শান্তির চিহ্ন।&#xA;&#xA;কিন্তু কাছে গেলে বুক ধক করে ওঠে।&#xA;!--more--&#xA;পায়রাটার চোখ নেই, তার জায়গায় একটা নিষ্ঠুর ক্রস। ডানা দুটো নেতিয়ে পড়ে আছে, যেন এইমাত্র আকাশ থেকে খসে পড়ল। আঙুলে বাঁধা সাদা সুতোটা এখনো কাঁপছে বাতাসে। কোনো একদিন এই সুতো বেঁধেছিল আশাকে, আজ সে বেঁধে রেখেছে একটা লাশ।&#xA;&#xA;এই একটা ছবিতেই যেন লেখা আছে আমাদের সময়ের সবচেয়ে করুণ সত্য।&#xA;&#xA;যুদ্ধ আসে ঝড়ের মতো। যা কিছু গড়ে উঠেছিল বছরের পর বছর ধরে- একটা বাড়ি, একটা সংসার, একটা শৈশবের হাসি; এক লহমায় তা মিশে যায় ধুলোয়। মা তার সন্তানকে খুঁজে পায় না, সন্তান তার মায়ের কবরটুকুও চিনতে পারে না। যে উঠোনে বসে দাদু গল্প শোনাতেন, সেই উঠোনে আজ শুধু ভাঙা ইটের স্তূপ আর নীরবতা, সীমাহীন নীরবতা।&#xA;&#xA;আর এই সব হারানোর পর, যখন কামানের গর্জন থামে, তখন কেউ একজন এসে বলে- আমরা জিতেছি!&#xA;জিতেছি? কী জিতেছি??&#xA;&#xA;গাজার ধুলোমাখা রাস্তায় যে বাবা তার মেয়ের ছোট্ট জুতোজোড়া বুকে চেপে ধরে বসে থাকেন, ইউক্রেনের বরফঢাকা মাঠে যে স্ত্রী তার স্বামীর ফিরে আসার অপেক্ষায় জানালার পাশে বসে থাকেন প্রতিটা সন্ধ্যা, সুদানের ধ্বংসস্তূপে যে শিশু তার খেলার সাথীকে আর কোনোদিন ডাকতে পারবে না; তাদের কাছে &#34;জয়&#34; শব্দটা কি আদৌ কোনো অর্থ বহন করে? নাকি এই শব্দটাই এখন সবচেয়ে নিষ্ঠুর এক উপহাস, যা মানুষের কান্নার ওপর দিয়ে হেঁটে যায়?&#xA;&#xA;মানুষ বহুকাল ধরে পায়রাকে বেছে নিয়েছে শান্তির প্রতীক হিসেবে, কারণ পায়রা উড়ে যায়- সীমানা মানে না, কাঁটাতার মানে না, কেবল আকাশের দিকে ছুটে যায় মুক্তির নেশায়। কিন্তু যখন সেই পায়রাকে মৃত অবস্থায় হাতে তুলে ধরে বলা হয়- &#34;এই দেখো, শান্তি এসেছে&#34;; তখন সেটা আর প্রতীক থাকে না, হয়ে ওঠে একটা উপহাস।&#xA;&#xA;কারণ মৃত পায়রা উড়তে পারে না। সে কোনো বার্তা বয়ে নিয়ে যায় না, কারও কাছে পৌঁছায় না। সে শুধু পড়ে থাকে, নিথর, নিঃশ্বাসহীন- ঠিক যেমন যুদ্ধ-পরবর্তী প্রতিটা &#34;শান্তিচুক্তি&#34; পড়ে থাকে কাগজের পাতায়, অথচ মানুষের বুকের ভেতরে দগদগে ক্ষতটা রয়েই যায়।&#xA;&#xA;একটা যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হলে ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে হাত মেলানো হয়। কিন্তু যে মা তার সন্তানকে হারিয়েছেন, তার কাছে সেই হাসি কি পৌঁছায়? যে শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, সেই ইটপাথরের নিচে চাপা পড়ে থাকা স্বপ্নগুলো কি আর কোনোদিন জেগে ওঠে? &#xA;&#xA;শান্তি যদি সত্যিই আসত, তবে তা আসত কান্না মুছে দিয়ে, ঘর ফিরিয়ে দিয়ে, হারানো মানুষগুলোকে বুকে টেনে নেবার মাধ্যমে। কিন্তু যুদ্ধ শুধু নিতে জানে, বিমিময়ে সে কিছুই ফেরত দিতে জানে না। এমনকি শেষে যে শান্তির কথা বলা হয়, সেই শান্তিটুকুও সে দিতে পারে না। সে শুধু একটা মৃতদেহ ধরিয়ে দেয়, আর বলে- এই নাও, এটাই তোমার প্রাপ্তি।&#xA;&#xA;লক্ষ্য করে দেখুন, ছবির হাতটা কালো, শক্ত, যেন লোহার তৈরি। অথচ প্রতিটা হাতই একদিন কোমল ছিল। এই হাতই হয়ত একদিন সন্তানের কপালে চুমু এঁকে দিত, প্রিয়জনের হাত ধরে হাঁটত সন্ধ্যার আলোয়। যুদ্ধ প্রথম সুযোগেই সেই কোমলতাকে কেড়ে নিয়েছে। মানুষকে বাধ্য করেছে কঠিন হতে, নির্মম হতে, বেঁচে থাকার জন্য নিজের ভেতরের ভালোবাসাটুকু চাপা দিতে। &#xA;&#xA;তারপর একদিন, সেই বদলে যাওয়া হাতেই তুলে ধরা হয় বিজয়ের চিহ্ন। অথচ কেউ প্রশ্ন করে না- এই হাত কতটা হারিয়েছে নিজেকে ফিরে পাওয়ার আগে? কতটা ভালোবাসা পুড়ে ছাই হয়েছে এই একটা মুহূর্তের জন্য, যেখানে মানুষ দাঁড়িয়ে বলছে- দেখো, আমি জিতেছি!&#xA;&#xA;যুদ্ধ কোনোদিন শান্তি দেয় না। যুদ্ধ শুধু জানে কীভাবে কেড়ে নিতে হয় মানুষ, ঘর, শৈশব, বিশ্বাস আর ভালোবাসা। আর যখন সব কেড়ে নেওয়া শেষ হয়, তখন সে সান্ত্বনা হিসেবে হাতে ধরিয়ে দেয় একটা প্রতীক, একটা মিথ্যে জয়ের স্মারক- যা আসলে ফাঁপা, যার ভেতরে কোনো প্রাণ নেই। &#xA;&#xA;সেই মৃত পায়রাটার দিকে যতবার তাকাই, ততবার মনে হয়- এটাই তো যুদ্ধের আসল চেহারা। সে বিজয়ের নামে দাঁড় করিয়ে দেয় একটা শূন্যতা। সে হাতে তুলে দেয় শান্তির খোলস, কিন্তু আত্মাটা রেখে দেয় নিজের কাছে, চিরদিনের জন্য। &#xA;&#xA;আর তাই, যতদিন না আমরা বুঝব যে যুদ্ধ কখনো জয়ী করে না, শুধু হারায়- ততদিন পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে কোনো না কোনো হাত এভাবেই তুলে ধরবে একটা মৃত পায়রা, আর তাকেই ভুল করে ডাকবে শান্তি বলে।&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀]]&gt;</description>
      <content:encoded><![CDATA[<p><img src="https://i.ibb.co/cK4StS96/PI-mrito-payrar-joy.jpg" alt="মৃত পায়রার জয়"></p>

<p>একটা হাত উঠে আছে আকাশের দিকে। কালো, শক্ত, বিজয়ের ভঙ্গিতে দুটো আঙুল ছুঁয়ে গেছে শূন্যতাকে। সেই আঙুলের বাঁধনে গোঁজা একটা সাদা পায়রা। দূর থেকে দেখলে বুকটা একবার নেচে ওঠে- আহা, শান্তি এসেছে বুঝি! যুদ্ধ থেমেছে, রক্ত থেমেছে, কেউ একজন হাতে তুলে নিয়েছে শান্তির চিহ্ন।</p>

<p>কিন্তু কাছে গেলে বুক ধক করে ওঠে।

পায়রাটার চোখ নেই, তার জায়গায় একটা নিষ্ঠুর ক্রস। ডানা দুটো নেতিয়ে পড়ে আছে, যেন এইমাত্র আকাশ থেকে খসে পড়ল। আঙুলে বাঁধা সাদা সুতোটা এখনো কাঁপছে বাতাসে। কোনো একদিন এই সুতো বেঁধেছিল আশাকে, আজ সে বেঁধে রেখেছে একটা লাশ।</p>

<p>এই একটা ছবিতেই যেন লেখা আছে আমাদের সময়ের সবচেয়ে করুণ সত্য।</p>

<p>যুদ্ধ আসে ঝড়ের মতো। যা কিছু গড়ে উঠেছিল বছরের পর বছর ধরে- একটা বাড়ি, একটা সংসার, একটা শৈশবের হাসি; এক লহমায় তা মিশে যায় ধুলোয়। মা তার সন্তানকে খুঁজে পায় না, সন্তান তার মায়ের কবরটুকুও চিনতে পারে না। যে উঠোনে বসে দাদু গল্প শোনাতেন, সেই উঠোনে আজ শুধু ভাঙা ইটের স্তূপ আর নীরবতা, সীমাহীন নীরবতা।</p>

<p>আর এই সব হারানোর পর, যখন কামানের গর্জন থামে, তখন কেউ একজন এসে বলে- আমরা জিতেছি!
জিতেছি? কী জিতেছি??</p>

<p>গাজার ধুলোমাখা রাস্তায় যে বাবা তার মেয়ের ছোট্ট জুতোজোড়া বুকে চেপে ধরে বসে থাকেন, ইউক্রেনের বরফঢাকা মাঠে যে স্ত্রী তার স্বামীর ফিরে আসার অপেক্ষায় জানালার পাশে বসে থাকেন প্রতিটা সন্ধ্যা, সুদানের ধ্বংসস্তূপে যে শিশু তার খেলার সাথীকে আর কোনোদিন ডাকতে পারবে না; তাদের কাছে “জয়” শব্দটা কি আদৌ কোনো অর্থ বহন করে? নাকি এই শব্দটাই এখন সবচেয়ে নিষ্ঠুর এক উপহাস, যা মানুষের কান্নার ওপর দিয়ে হেঁটে যায়?</p>

<p>মানুষ বহুকাল ধরে পায়রাকে বেছে নিয়েছে শান্তির প্রতীক হিসেবে, কারণ পায়রা উড়ে যায়- সীমানা মানে না, কাঁটাতার মানে না, কেবল আকাশের দিকে ছুটে যায় মুক্তির নেশায়। কিন্তু যখন সেই পায়রাকে মৃত অবস্থায় হাতে তুলে ধরে বলা হয়- “এই দেখো, শান্তি এসেছে”; তখন সেটা আর প্রতীক থাকে না, হয়ে ওঠে একটা উপহাস।</p>

<p>কারণ মৃত পায়রা উড়তে পারে না। সে কোনো বার্তা বয়ে নিয়ে যায় না, কারও কাছে পৌঁছায় না। সে শুধু পড়ে থাকে, নিথর, নিঃশ্বাসহীন- ঠিক যেমন যুদ্ধ-পরবর্তী প্রতিটা “শান্তিচুক্তি” পড়ে থাকে কাগজের পাতায়, অথচ মানুষের বুকের ভেতরে দগদগে ক্ষতটা রয়েই যায়।</p>

<p>একটা যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হলে ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে হাত মেলানো হয়। কিন্তু যে মা তার সন্তানকে হারিয়েছেন, তার কাছে সেই হাসি কি পৌঁছায়? যে শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, সেই ইটপাথরের নিচে চাপা পড়ে থাকা স্বপ্নগুলো কি আর কোনোদিন জেগে ওঠে?</p>

<p>শান্তি যদি সত্যিই আসত, তবে তা আসত কান্না মুছে দিয়ে, ঘর ফিরিয়ে দিয়ে, হারানো মানুষগুলোকে বুকে টেনে নেবার মাধ্যমে। কিন্তু যুদ্ধ শুধু নিতে জানে, বিমিময়ে সে কিছুই ফেরত দিতে জানে না। এমনকি শেষে যে শান্তির কথা বলা হয়, সেই শান্তিটুকুও সে দিতে পারে না। সে শুধু একটা মৃতদেহ ধরিয়ে দেয়, আর বলে- এই নাও, এটাই তোমার প্রাপ্তি।</p>

<p>লক্ষ্য করে দেখুন, ছবির হাতটা কালো, শক্ত, যেন লোহার তৈরি। অথচ প্রতিটা হাতই একদিন কোমল ছিল। এই হাতই হয়ত একদিন সন্তানের কপালে চুমু এঁকে দিত, প্রিয়জনের হাত ধরে হাঁটত সন্ধ্যার আলোয়। যুদ্ধ প্রথম সুযোগেই সেই কোমলতাকে কেড়ে নিয়েছে। মানুষকে বাধ্য করেছে কঠিন হতে, নির্মম হতে, বেঁচে থাকার জন্য নিজের ভেতরের ভালোবাসাটুকু চাপা দিতে।</p>

<p>তারপর একদিন, সেই বদলে যাওয়া হাতেই তুলে ধরা হয় বিজয়ের চিহ্ন। অথচ কেউ প্রশ্ন করে না- এই হাত কতটা হারিয়েছে নিজেকে ফিরে পাওয়ার আগে? কতটা ভালোবাসা পুড়ে ছাই হয়েছে এই একটা মুহূর্তের জন্য, যেখানে মানুষ দাঁড়িয়ে বলছে- দেখো, আমি জিতেছি!</p>

<p>যুদ্ধ কোনোদিন শান্তি দেয় না। যুদ্ধ শুধু জানে কীভাবে কেড়ে নিতে হয় মানুষ, ঘর, শৈশব, বিশ্বাস আর ভালোবাসা। আর যখন সব কেড়ে নেওয়া শেষ হয়, তখন সে সান্ত্বনা হিসেবে হাতে ধরিয়ে দেয় একটা প্রতীক, একটা মিথ্যে জয়ের স্মারক- যা আসলে ফাঁপা, যার ভেতরে কোনো প্রাণ নেই।</p>

<p>সেই মৃত পায়রাটার দিকে যতবার তাকাই, ততবার মনে হয়- এটাই তো যুদ্ধের আসল চেহারা। সে বিজয়ের নামে দাঁড় করিয়ে দেয় একটা শূন্যতা। সে হাতে তুলে দেয় শান্তির খোলস, কিন্তু আত্মাটা রেখে দেয় নিজের কাছে, চিরদিনের জন্য।</p>

<p>আর তাই, যতদিন না আমরা বুঝব যে যুদ্ধ কখনো জয়ী করে না, শুধু হারায়- ততদিন পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে কোনো না কোনো হাত এভাবেই তুলে ধরবে একটা মৃত পায়রা, আর তাকেই ভুল করে ডাকবে শান্তি বলে।</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>
]]></content:encoded>
      <guid>https://infosec.press/lokmanus/mrt-paay-raar-jy</guid>
      <pubDate>Thu, 10 Sep 2026 17:55:00 +0000</pubDate>
    </item>
    <item>
      <title>একাকীত্বের সঙ্গী</title>
      <link>https://infosec.press/lokmanus/ekaakiitber-snggii</link>
      <description>&lt;![CDATA[&#xA;&#xA;টেলিপোর্টার আবিষ্কারের পর পৃথিবী থেকে সবার আগে হারিয়ে গিয়েছিল ‘দূরত্ব’ নামক ধারণাটি। কোথাও পৌঁছানোর ব্যাপারে মানুষ মুক্ত হয়েছিল অপেক্ষার হাত থেকে। প্রথম দফায় যন্ত্রগুলো বসানো হয়েছিল এমন সব স্থানে যেগুলো ছিলো মানুষের চিরচেনা গন্তব্য। ব্যস্ত শহরের কেন্দ্র, কোলাহলপূর্ণ বিমানবন্দর, ঝলমলে সমুদ্রসৈকত আর পাহাড়ি রিসোর্টের চূড়ায়। এক প্যাডে দাঁড়িয়ে চোখের পলকে মানুষ পৌঁছে যাচ্ছিল পৃথিবীর আরেক প্রান্তে।&#xA;!--more--&#xA;&#xA;দ্বিতীয় দফায় টেলিপোর্টার গুলো হয়ে উঠে আরও উন্নত, আরও দ্রুত এবং আরও সহজ। টেলিপোর্টার গুলো মানুষের নাগালের বাইরে থাকা দুর্গম সব জায়গার দরজা খুলে দিল। বরফের তলদেশের গবেষণাকেন্দ্র, মেঘছোঁয়া পর্বতচূড়া, সমুদ্রের গভীর পর্যবেক্ষণ কক্ষ, জনমানবহীন প্রবালদ্বীপ। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষ এক করুণ সত্য আবিষ্কার করল। সত্যটি হলো- দূরে চলে যাওয়া আর সত্যিকার অর্থে একা থাকা এক জিনিস নয়। পৃথিবীর যত সুন্দর জায়গা আছে, তার প্রতিটি কোনায় শেষ পর্যন্ত মানুষের পায়ের ছাপ পড়তে লাগলো, আর মানুষ পৌঁছানোর সাথে সাথেই সেখানে ভিড় জমে উঠলো, শব্দ গুলো ধীরে ধীরে পরিণত হলো কোলাহলে, ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে হারাতে থাকলো মানুষের একাকিত্ব।&#xA;&#xA;বেশ অনেক পরে আগমন ঘটলো তৃতীয় প্রজন্মের টেলিপোর্টারের। তবে এবারের টেলিপোর্টেশনের ধারণা বেশ অনেকটাই বদলে গেলো। ততদিনে মানুষ বুঝে গিয়েছিলো একান্তে সময় কাটানোর মর্ম। তাই টেলিপোর্টার গুলোও তৈরি হয়েছিল সেই ধারণাকে ভিত্তি করে। এবার আর গন্তব্য গুলো নির্দিষ্ট ছিলো না। ছিলো না কোন নাম, কোনো ছবি ছিল না, কোনো পরিচিতিও ছিল না। যাত্রীরা কেবল বেছে নেয়ার সুযোগ পেতো তাদের পছন্দ মতো সময়। আর টেলিপোর্টার কোম্পানি কেবল একটা নিশ্চয়তা দিত- নির্ধারিত সময়ে সেই স্থানে পৃথিবীর আর কোনো জীবিত মানুষ উপস্থিত থাকবে না। বিজ্ঞাপনের একদম নিচে সূক্ষ্ম অক্ষরে লেখা থাকত, “কিছু নীরবতা শুধু একজনের জন্যই তৈরি হয়।”&#xA;&#xA;পাঁচ বছর আগে তার স্ত্রী মেঘলাকে হারানোর পর থেকে রাইয়্যানের কাছে সন্ধ্যার সময়টা এক অদ্ভুত যন্ত্রণার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দিনের বেলায় সে আর দশ জনের মতোই একদম স্বাভাবিক একজন মানুষ। অফিসের কাজ সারে, সহকর্মীদের সাথে হাসে, বাজার করে, প্রয়োজনে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তর্কও করে। কিন্তু সন্ধ্যা নেমে এলেই বাড়ির দরজা পেরিয়ে এক ধরনের বিস্তৃত শূন্যতা তাকে গিলে ফেলে, মনে হয় দিনের ঐ মানুষটি দরজার বাইরেই আটকে আছে।&#xA;&#xA;শুরুতে সে মেঘলাকে খুব স্পষ্টভাবে মনে করতে পারত, তার কথা বলার ভঙ্গি, ঘুমানোর আগে বই পড়ার অভ্যাস, রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে অন্যমনস্কভাবে গান গাওয়ার সুর …..সবকিছু। কিন্তু বছর গড়াতে থাকতেই স্মৃতিগুলো অদ্ভুতভাবে বিকৃত হতে লাগল, মেঘলার মুখ মনে করতে গেলে কখনো তাকে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ দেখাত, আবার কখনো মনে হতো মুখটা ঘন কুয়াশায় ঢেকে ঝাপসা হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ভয় পেত সে এই দ্বিতীয় অনুভূতিটাকে, মেঘলাকে হারানোর চেয়েও তাকে ভুলে যাওয়ার আশঙ্কাটা তাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত।&#xA;&#xA;তৃতীয় প্রজন্মের টেলিপোর্টারের ঐ অদ্ভুত বিজ্ঞাপনটি রাইয়্যান প্রথম দেখেছিল এমনই এক সন্ধ্যায়; ঠিক সেই সময় যখন ঘরের নিস্তব্ধতা তাকে চারপাশ থেকে চেপে ধরছিল। বিজ্ঞাপনটা পড়ার পর তার মনে হয়েছিল, হয়ত তিন দিনের জন্য পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সে অন্তত নিজের স্মৃতিগুলোর সাথে নিরিবিলিতে সময় কাটানোর একটা সুযোগ হবে। সেখানে কেউ তাকে সান্ত্বনা দেবে না, কেউ বলবে না যে- আহা! পাঁচটা বছর কেটে গেছে, এবার তোমার সামনে তাকানো উচিত।&#xA;&#xA;সিদ্ধান্তটা সে খুব দ্রুতই নিয়েছিল, যেন দীর্ঘদিনের জমানো একটা সিদ্ধান্ত অবশেষে বাস্তব রূপ পেতে চলেছে। যদিও এবারের টেলিপোর্টেশনের টিকিটের দাম ছিলো তার নাগালের বাইরে। তবুও সে সিদ্ধান্ত নিলো সে এটা করবেই। সেই সিদ্ধান্তেই আট মাসের ইউনিট জমা করে যখন টিকিটটি কিনলো তখন তাকে বেশ দীর্ঘ কয়েকটা ফরম পূরণ করতে হয়েছিল। তার নিজের সম্পর্কে বেশ খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে জানাতে হয়েছিল টেলিপোর্টেশন কোম্পানিকে। তার ঠিক দু’দিন পর তার যাত্রার দিন নির্ধারিত হলো।&#xA;&#xA;যাত্রার দিন টার্মিনালে দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছিল, সে কোনো ভ্রমণে যাচ্ছে না, বরং এমন এক সিদ্ধান্তের গভীরে ঢুকে পড়ছে- যার শেষটা সে নিজেও জানে না। টার্মিনালটি ছিল আশ্চর্যরকম নীরব, বিশাল সাদা ঘরের মাঝখানে গোলাকার প্যাডটি ছাড়া আর কিছু নেই, দেয়ালজুড়ে কোনো বিজ্ঞাপন নেই, কোনো কর্মচারী নেই, শুধু মেঝের নিচে নীল আলো ধীরে ধীরে জ্বলছে আর নিভছে।&#xA;&#xA;রাইয়্যান প্যাডের ওপর দাঁড়াতেই একটি যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে এল-&#xA;— “আপনি কি নিশ্চিত?”&#xA;&#xA;প্রশ্নটা শুনে সে সামান্য হাসল, জিজ্ঞেস করলো- “কীসের ব্যাপারে?”&#xA;&#xA;কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর এল না, তারপর কণ্ঠটি আবার বলল-‌&#xA;— “আপনি কি একাই যেতে চান?”&#xA;&#xA;রাইয়্যানের হাসিটা মিলিয়ে গেল, সে বলল- “হ্যাঁ।”&#xA;&#xA;আলো জ্বলে উঠল, আর পৃথিবী সরে গেল। চোখ খুলে প্রথম যে অনুভূতিটা হলো, সেটা ছিল বাতাসের; বাতাসে লবণের গন্ধ, তার সাথে ভেজা কাঠের একটা মৃদু গন্ধ মিশে আছে। সামনে সমুদ্র, দূরে জলরাশি আকাশের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে মাঝখানে কোনো দিগন্তরেখা নেই, যেন পৃথিবীটা ওই পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। রাইয়্যান টেলিপোর্টেশন প্যাড থেকে নেমে ধীরে ধীরে বালির ওপর হাঁটল, পায়ের নিচে নরম বালি দেবে যাচ্ছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কোনো শব্দ হচ্ছিল না, সে থেমে নিজের পায়ের ছাপের দিকে তাকাল, এরপর পর আবার হাঁটা শুরু করলো।&#xA;&#xA;সামনে একটি ছোট বাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, কাঠের তৈরি, নিচু ছাদ, সামনে বারান্দা। বাড়িটাকে দেখে রাইয়্যানের মনে হলো, সে যেন আগে কোথাও এই বাড়িটা দেখেছে, হয়ত কোনো ছবিতে, হয়ত কোনো স্বপ্নে, নয়তো এমন কোনো কল্পনায় যেটা সে কখনো নিজেকেই ঠিকমতো বলতে পারেনি। ভেতরে ঢুকে সেই অনুভূতিটা আরও তীব্র হলো, সবকিছু অপরিচিত, অথচ খুব অদ্ভুত রকমের পরিচিত। টেবিলের উপর রাখা কফির জারটি ঠিক সেই ব্র্যান্ডের যা সে বাড়িতে ব্যবহার করে; বইয়ের তাকের তৃতীয় সারিতে তার প্রিয় লেখকের সেই বইটি, যেটার শেষ কয়েক পাতা সে কোনোদিন পড়েনি; জানালার পাশে একটি কাঠের চেয়ার, যেটাতে বসে মেঘলা প্রতিদিন বিকেলে চা খেত।&#xA;&#xA;রাইয়্যান প্রথমে এসবকে প্রযুক্তির পরিশীলিত সৌজন্য বলেই ভেবেছিল, বুকিংয়ের আগে কোম্পানি তার জীবনযাত্রা সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেছে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রান্নাঘরের তাকের ওপর রাখা নীল কাপটি দেখে তার সেই ব্যাখ্যাটা আর যথেষ্ট মনে হলো না। নীল রঙের কাপটির কিনারে সূক্ষ্ম একটি ফাটল, হুবহু সেখানেই যেটা মেঘলার কাপেও ছিলো।&#xA;&#xA;এক সকালে কাপটি হাতে নিয়ে মেঘলা বলেছিল, “দেখেছ? এখনও টিকে আছে।” রাইয়্যান তখন বলেছিল, “একদিন ভেঙে যাবে।” মেঘলা হেসে বলেছিল, “ভেঙে গেলেই কি সবকিছু ফেলে দেয়া যায়? যায় না, বুঝলে।” স্মৃতিটা এত হঠাৎ, এত স্পষ্টভাবে ফিরে এল যে রাইয়্যানের মনে হলো, কেউ যেন তার কানের কাছে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলে গেল। সে কাপটির দিকে হাত বাড়িয়েও ছুঁয়ে দেখলো না, কারণ তার মনে হচ্ছিল, একবার ছুঁয়ে দেখলেই হয়ত তাকে মেনে নিতে হবে- এটা মোটেই কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়।&#xA;&#xA;বিকেল নামার পর দ্বীপের রং বদলে গেল, সূর্যের আলো নরম হতে হতে সমুদ্রের বুকের উপর গলিত তামার মতো ছড়িয়ে পড়ল, আকাশে জমল অস্পষ্ট গোলাপি আভা। রাইয়্যান বারান্দায় বসে ছিল, পাশাপাশি দুটি চেয়ার, সে যে চেয়ারে বসেছিল, তার পাশের চেয়ারটি খালি। কিছুক্ষণ পর সে লক্ষ্য করল, খালি চেয়ারটির ওপর একটি ভাঁজ করা কাপড় রাখা, সকালে সেটা সেখানে ছিল না। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল, কাপড়টা ছিল হালকা ধূসর রঙের একটি শাল। সে হাত দিয়ে স্পর্শ করল, পরিচিত কোনো গন্ধ নেই, কোনো নাম নেই, কিছুই নেই যা প্রমাণ করবে এটি মেঘলার। তবু সে খুব যত্ন করে ভাঁজটা ঠিক করে আবার চেয়ারটির উপর রেখে দিল, এমনভাবে, যেন খুব পরিচিত কেউ পরে এসে সেটা গায়ে জড়াবে।&#xA;&#xA;নিজের এই আচরণের উপর নিজেই বিরক্ত হয়ে সে জোরে বলে উঠল, “আমি কী করছি?”&#xA;&#xA;প্রশ্নটা সে জোরে বলেছিল, উত্তর আসেনি। কিন্তু সে লক্ষ্য করল, তার নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে অদ্ভুত লাগছে, যেন বহুদিন ধরে সে কারও সাথে কথা বলেনি।&#xA;&#xA;সন্ধ্যার একটু আগে রাইয়্যান সমুদ্রের ধারে হাঁটতে বের হলো। এবার সে নিজের পায়ের ছাপগুলো লক্ষ্য করছিল, ঢেউ এসে ধীরে ধীরে সেগুলো মুছে দিচ্ছে। সে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা দূরে চলে গেল, হঠাৎ তার চোখে পড়ল বালির ওপর একটি ছোট পাথরের বৃত্ত। কেউ যেন খুব যত্ন করে পাথরগুলো সাজিয়ে রেখেছে। বৃত্তটির মাঝখানে একটি শুকনো শামুকের খোলস, রাইয়্যান সেখানে বসে পড়ল। তার মনে পড়ল, মেঘলা সমুদ্রতীরে শামুক দেখলেই সবসময় একটা শামুকের খোলস কুড়িয়ে নিত, তারপর কিছুক্ষণ হাতের তালুতে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আবার ফেলে দিত। “নেবে না?” রাইয়্যান একবার জিজ্ঞেস করেছিল। “না,” মেঘলা বলেছিল, “ওটার জায়গা ওখানেই।” রাইয়্যানের বুকের ভেতর হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল, সে চারদিকে তাকাল, কেউ নেই, সমুদ্র, আকাশ আর তার নিজের ছায়া, তবু পাথরগুলো কেউ সাজিয়েছে। সে কি সকালে এখানে এসেছিল?! অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না।&#xA;&#xA;সেই রাতে রাইয়্যান ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি, বিছানায় শুয়ে সমুদ্রের শব্দ শুনছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো দিনের বেলায় যে সমুদ্র প্রায় শব্দহীন ছিল, রাত বাড়ার সাথে সাথে তার ঢেউয়ের আওয়াজ যেন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। কখনো মনে হচ্ছিল, জল তীরে এসে ভাঙছে, আবার কখনো মনে হচ্ছিল, কেউ বাড়ির চারপাশে খুব ধীর পায়ে হাঁটছে। কিন্তু রাইয়্যান জানত, সেখানে কেউ নেই, সে নিজেকেই বারবার সেই কথাটা মনে করিয়ে দিল- আমি একাই এসেছি। রাতের কোনো এক সময় তার ঘুম এসে গিয়েছিল, সকালে ঘুম ভাঙার পর সে প্রথমে বুঝতে পারেনি কী তাকে জাগিয়েছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে, ঘর নিস্তব্ধ, তারপর তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর, সেখানে দুটো কাপ রাখা। একটিতে আগের রাতের কফির শুকিয়ে যাওয়া দাগ, অন্যটিতে চা, ধোঁয়া নেই, কিন্তু চায়ের রং এখনও গাঢ়।&#xA;&#xA;রাইয়্যান বিছানা থেকে উঠে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, সে জানত, দ্বিতীয় কাপটি সে রাখেনি। তারপরও তার প্রথম ভাবনায় এলো- ভোর সকাল করে মেঘলাও এমন কড়া চা খেত; পরক্ষণেই সে এই চিন্তাটার জন্য নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করলো। সে বুঝতে পারছিল, তার অবচেতন মন নিজে থেকেই প্রতিটি ঘটনার সাথে মেঘলাকে জুড়ে দিচ্ছে। নীল রঙা মেঘলার কাপ, ভাজ করা মেঘলার শাল, সমুদ্র তীরে মেঘলার হাতে শামুকের খোলস, আর এখনকার এই কড়া চা — সেটাও মেঘলার। হয়ত এসব কিছুই তাকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে, হয়ত কোম্পানির কোনো অ্যালগরিদম তার স্মৃতির দুর্বল জায়গাগুলো জানে। অথবা… -এই শেষ সম্ভাবনাটাই সে ভাবতে চাইলো না।&#xA;&#xA;দুপুরের দিকে রাইয়্যান বাড়ির ভেতরে আরও কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন দেখতে পেল, বইয়ের তাকের ওপর যে বইটি আগের দিন বন্ধ অবস্থায় ছিল, সেটি এখন খোলা, পাতার মাঝখানে একটি শুকনো পাতা রাখা। রাইয়্যান বইটি তুলে নিল, পাতাটি কোথা থেকে এসেছে, সে জানে না, কিন্তু বইয়ের যে পাতায় সেটি রাখা, সেখানে একটি বাক্য দাগ দেওয়া-&#xA;&#xA;“মানুষ কখনো কখনো ফিরে আসে না, তবু তার জন্য জায়গা থেকে যায়।”&#xA;&#xA;রাইয়্যান বইটি বন্ধ করে ফেলল, তার হাত কাঁপছিল না, সে ভয়ও পাচ্ছিল না, বরং তার ভেতরে অন্যরকম একটা অস্থিরতা তৈরি হচ্ছিল। যদি সত্যিই কেউ এখানে থাকে? আর যদি কেউ না থাকে? এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে কোনটা সে বেশি ভয় পায়, রাইয়্যান বুঝতে পারছিল না। কারণ কেউ থাকলে তাকে এমন কিছু বিশ্বাস করতে হবে, যা বিশ্বাস করা সম্ভব নয়, আর কেউ না থাকলে তাকে স্বীকার করতে হবে, সে নিজেই হয়ত এসব ঘটাচ্ছে- কখনো জেগে, কখনো ঘুমের ভেতর এসব সাজিয়ে যাচ্ছে; এবং পরে কিছুই মনে রাখতে পারছে না, যা হয়ত তার চেয়েও ভয়াবহ।&#xA;&#xA;সেদিন বিকেলে সে সিদ্ধান্ত নিল, আর কোনো কিছু নিয়ে অনুমান করবে না, সে রান্নাঘরের টেবিল পরিষ্কার করে দিল, দুটি কাপ ধুয়ে উলটো করে রাখল, চেয়ার দুটো পাশাপাশি ঠেলে দিল, বারান্দায় থাকা শালটি ভাঁজ করে আলমারির ভেতর রেখে দিল। তারপর সে বাড়ির প্রতিটি ঘর ঘুরে দেখল, কোথাও কেউ নেই, সে দরজা বন্ধ করল, জানালা আটকাল, মেঝের ওপর এক টুকরো বালি ছড়িয়ে দিল, যাতে কেউ হাঁটলে পায়ের ছাপ পড়ে। সবশেষে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল, বিকেল ৫টা ৪০। সে সিদ্ধান্ত নিল, সূর্য ডোবার আগে আর কোথাও যাবে না। বারান্দার চেয়ারে বসে থাকবে, কেউ এলে দেখবে, কেউ না এলে অন্তত নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে।&#xA;&#xA;সূর্য ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছিল, সমুদ্রের ওপর আলো ছোট হয়ে আসছিল, আকাশের রং কমলা থেকে গাঢ় বেগুনিতে বদলে যাচ্ছিল, দ্বীপের বাতাসের নোনা স্বাদের সাথে যেন এক ধরনের চাপা প্রতীক্ষার চাপ তৈরি হতে থাকলো। রাইয়্যান চেয়ারে বসে ছিল, চোখ বাড়ির দরজার দিকে। সময় যাচ্ছিল, কেউ আসেনি, বালির উপর কেন পায়ের ছাপ পড়লো না, কোথাও অস্বাভাবিক কোন শব্দও হলো না।&#xA;&#xA;তারপর হঠাৎ সে খেয়াল করল, বারান্দার অন্য চেয়ারটিতে কেউ বসে নেই ঠিকই, কিন্তু চেয়ারটি সামান্য দোল খাচ্ছে, যেন কেউ একটু আগে উঠে গেছে চেয়ারটি থেকে। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল না, সে নিজের শ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল, “বাতাস”, সে মনে মনে বলল, কিন্তু তার মুখে কথা বেরোল না, কারণ বাতাস থেমে ছিল। কিছুক্ষণ পর বাড়ির ভেতর থেকে একটি শব্দ এল, খুব সাধারণ শব্দ, ড্রয়ারের শব্দ, কেউ যেন রান্নাঘরের ড্রয়ার খুলল। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল, তারপর আবার বসে পড়ল, সে বুঝতে পারছিল, তার শরীর বাড়ির ভেতরে যেতে চাইছে না, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, যদি না যায়, তাহলে বাকি সময়টা সে আর এখানে কাটাতে পারবে না। অনেকক্ষণ পরে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, দরজার কাছে গিয়ে থামল, তারপর ভেতরে ঢুকল, রান্নাঘর ফাঁকা, কিন্তু ড্রয়ারটি খোলা, ভেতরে একটি ছোট নোটবুক রাখা।&#xA;&#xA;রাইয়্যান জানে, নোটবুকটি তার নয়। সে সেটি হাতে নিল, প্রথম কয়েকটি পাতা খালি, তারপর একটি পাতায় লেখা দেখতে পেল। লেখাগুলো কাঁপা কাঁপা নয়, তাড়াহুড়ো করেও লেখা নয়, যেন কেউ শান্তভাবে বসে লিখেছে- “আজ সে আবার চেয়ার দুটো পাশাপাশি রেখে দিয়েছে।”&#xA;&#xA;রাইয়্যানের বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে এল, সে পরের লাইনটি পড়ল- “আজও সে বলবে, সে একা। আমি এখনও তাকে বলিনি যে সে গতকাল রাতে সমুদ্রের ধারে অনেকক্ষণ আমার সাথে বসে ছিল।”&#xA;&#xA;রাইয়্যান আর পড়তে পারল না, সে নোটবুক বন্ধ করে দিল, মনে করার চেষ্টা করল গত রাতের কথা, বিছানায় শোয়ার আগে সে কী করেছিল? সে কি সত্যিই বাইরে গিয়েছিল? তার মনে পড়ল না। এক মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে হলো নোটবুকটি ছিঁড়ে সমুদ্রে ফেলে দিতে। তারপর মনে হলো, সেটা করলে হয়ত সে শুধু প্রমাণটাই নষ্ট করবে, প্রশ্নটা নয়। সে নোটবুকটি টেবিলের ওপর রেখে টেলিপোর্টার প্যাডের দিকে হাঁটল, আজ দ্বিতীয় দিন, আরও চব্বিশ ঘণ্টা পর তার ফেরার অনুমতি।&#xA;&#xA;টেলিপোর্টারের স্ক্রিনের সামনে দাঁড়াল, সেখানে লেখা ছিল-&#xA;RETURN AVAILABLE IN 23:17:42&#xA;&#xA;তার নিচে আরেকটি লাইন জ্বলছিল-&#xA;PASSENGERS READY: 1&#xA;&#xA;রাইয়্যান স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, একজন, সে নিজেই, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর সংখ্যাটা ঝিলমিল করে উঠল, তারপর স্ক্রিনে নতুন করে লেখা এল-&#xA;PASSENGERS READY: 2&#xA;&#xA;রাইয়্যান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, সে পেছনে ঘুরে দেখল, দ্বীপে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে, বাড়ির জানালায় আলো জ্বলছে, বারান্দার দুটি চেয়ার পাশাপাশি, দূর থেকে মনে হলো, একটি চেয়ারে কেউ বসে আছে। রাইয়্যান চোখ কুঁচকে তাকাল, পরের মুহূর্তেই সেখানে শুধু শালটা পড়ে থাকতে দেখল- যেটা সে নিজের হাতে আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখেছিল। সে আবার স্ক্রিনের দিকে তাকাল, সংখ্যাটা তখনো দুই। আর ঠিক তখনই পেছন থেকে খুব ধীরে বাড়ির দরজা খোলার একটা মৃদু শব্দ ভেসে এল।&#xA;&#xA;রাইয়্যান চোখ বন্ধ করল, তার মনে হলো, এই মুহূর্তে তার সামনে দুটো পথ আছে। একটি পথ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই শহরে, যেখানে পাঁচ বছর ধরে সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে মেঘলা আর নেই। অন্য পথটি কোথায় নিয়ে যাবে, সে জানে না, শুধু এটুকু জানে- পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে, অথবা দাঁড়িয়ে নেই।&#xA;&#xA;ঠিক তখনই তার হাতের কনসোলটি কেঁপে উঠল, স্ক্রিনে ফেরার সময় হঠাৎ বদলে গেল-&#xA;RETURN AVAILABLE NOW&#xA;&#xA;তার নিচে লেখা উঠল- “দয়া করে যাত্রীর সংখ্যা নিশ্চিত করুন।” রাইয়্যান ধীরে ধীরে চোখ খুলল, তার আঙুল দুটি সংখ্যার মাঝখানে স্থির হয়ে রইল- 1 অথবা 2। পেছন থেকে তখন খুব পরিচিত স্বরে কেউ বলল- “রাইয়্যান, এবার কি আমাকে সত্যিই রেখে যাবে?”&#xA;&#xA;রাইয়্যান ঘুরে দাঁড়িয়েছিল কি না, সেটা কোনোদিন জানা যায়নি। পরদিন সকালে তৃতীয় তরঙ্গের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে শুধু একটাই সংকেত পৌঁছেছিল- টেলিপোর্টার প্যাড সক্রিয় হয়েছে, প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, কিন্তু যাত্রীসংখ্যার তথ্য অসম্পূর্ণ।&#xA;&#xA;রাইয়্যানের বুকিং ফাইলের একেবারে শেষ লাইনে, যা পরে কোম্পানির কোনো ইঞ্জিনিয়ার, কোনো অ্যালগরিদম, কোনো তদন্তকারী দল ব্যাখ্যা করতে পারেনি, সেখানে শুধু একটি ছোট্ট নতুন নোট যোগ হয়েছিল লাল অক্ষরে “RETURN NUMBER ERROR!”&#xA;&#xA;সেই দ্বীপে যদি কেউ কোনোদিন আবার যায়, তবে সে হয়ত দেখতে পাবে, বারান্দার দুটো চেয়ার এখনো পাশাপাশি রাখা, একটি চেয়ারের উপর একটি হালকা ধূসর শাল ভাঁজ করা, আর টেবিলের উপর দুটো কাপ। একটি খালি, অন্যটিতে অপেক্ষারত কড়া লিকারের ঠান্ডা চা।&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀]]&gt;</description>
      <content:encoded><![CDATA[<p><img src="https://i.ibb.co/wF8Th4CY/PI-img-ekakitter-songi-2026-09-04.jpg" alt=""></p>

<p>টেলিপোর্টার আবিষ্কারের পর পৃথিবী থেকে সবার আগে হারিয়ে গিয়েছিল ‘দূরত্ব’ নামক ধারণাটি। কোথাও পৌঁছানোর ব্যাপারে মানুষ মুক্ত হয়েছিল অপেক্ষার হাত থেকে। প্রথম দফায় যন্ত্রগুলো বসানো হয়েছিল এমন সব স্থানে যেগুলো ছিলো মানুষের চিরচেনা গন্তব্য। ব্যস্ত শহরের কেন্দ্র, কোলাহলপূর্ণ বিমানবন্দর, ঝলমলে সমুদ্রসৈকত আর পাহাড়ি রিসোর্টের চূড়ায়। এক প্যাডে দাঁড়িয়ে চোখের পলকে মানুষ পৌঁছে যাচ্ছিল পৃথিবীর আরেক প্রান্তে।
</p>

<p>দ্বিতীয় দফায় টেলিপোর্টার গুলো হয়ে উঠে আরও উন্নত, আরও দ্রুত এবং আরও সহজ। টেলিপোর্টার গুলো মানুষের নাগালের বাইরে থাকা দুর্গম সব জায়গার দরজা খুলে দিল। বরফের তলদেশের গবেষণাকেন্দ্র, মেঘছোঁয়া পর্বতচূড়া, সমুদ্রের গভীর পর্যবেক্ষণ কক্ষ, জনমানবহীন প্রবালদ্বীপ। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষ এক করুণ সত্য আবিষ্কার করল। সত্যটি হলো- দূরে চলে যাওয়া আর সত্যিকার অর্থে একা থাকা এক জিনিস নয়। পৃথিবীর যত সুন্দর জায়গা আছে, তার প্রতিটি কোনায় শেষ পর্যন্ত মানুষের পায়ের ছাপ পড়তে লাগলো, আর মানুষ পৌঁছানোর সাথে সাথেই সেখানে ভিড় জমে উঠলো, শব্দ গুলো ধীরে ধীরে পরিণত হলো কোলাহলে, ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে হারাতে থাকলো মানুষের একাকিত্ব।</p>

<p>বেশ অনেক পরে আগমন ঘটলো তৃতীয় প্রজন্মের টেলিপোর্টারের। তবে এবারের টেলিপোর্টেশনের ধারণা বেশ অনেকটাই বদলে গেলো। ততদিনে মানুষ বুঝে গিয়েছিলো একান্তে সময় কাটানোর মর্ম। তাই টেলিপোর্টার গুলোও তৈরি হয়েছিল সেই ধারণাকে ভিত্তি করে। এবার আর গন্তব্য গুলো নির্দিষ্ট ছিলো না। ছিলো না কোন নাম, কোনো ছবি ছিল না, কোনো পরিচিতিও ছিল না। যাত্রীরা কেবল বেছে নেয়ার সুযোগ পেতো তাদের পছন্দ মতো সময়। আর টেলিপোর্টার কোম্পানি কেবল একটা নিশ্চয়তা দিত- নির্ধারিত সময়ে সেই স্থানে পৃথিবীর আর কোনো জীবিত মানুষ উপস্থিত থাকবে না। বিজ্ঞাপনের একদম নিচে সূক্ষ্ম অক্ষরে লেখা থাকত, “কিছু নীরবতা শুধু একজনের জন্যই তৈরি হয়।”</p>

<p>পাঁচ বছর আগে তার স্ত্রী মেঘলাকে হারানোর পর থেকে রাইয়্যানের কাছে সন্ধ্যার সময়টা এক অদ্ভুত যন্ত্রণার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দিনের বেলায় সে আর দশ জনের মতোই একদম স্বাভাবিক একজন মানুষ। অফিসের কাজ সারে, সহকর্মীদের সাথে হাসে, বাজার করে, প্রয়োজনে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তর্কও করে। কিন্তু সন্ধ্যা নেমে এলেই বাড়ির দরজা পেরিয়ে এক ধরনের বিস্তৃত শূন্যতা তাকে গিলে ফেলে, মনে হয় দিনের ঐ মানুষটি দরজার বাইরেই আটকে আছে।</p>

<p>শুরুতে সে মেঘলাকে খুব স্পষ্টভাবে মনে করতে পারত, তার কথা বলার ভঙ্গি, ঘুমানোর আগে বই পড়ার অভ্যাস, রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে অন্যমনস্কভাবে গান গাওয়ার সুর …..সবকিছু। কিন্তু বছর গড়াতে থাকতেই স্মৃতিগুলো অদ্ভুতভাবে বিকৃত হতে লাগল, মেঘলার মুখ মনে করতে গেলে কখনো তাকে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ দেখাত, আবার কখনো মনে হতো মুখটা ঘন কুয়াশায় ঢেকে ঝাপসা হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ভয় পেত সে এই দ্বিতীয় অনুভূতিটাকে, মেঘলাকে হারানোর চেয়েও তাকে ভুলে যাওয়ার আশঙ্কাটা তাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত।</p>

<p>তৃতীয় প্রজন্মের টেলিপোর্টারের ঐ অদ্ভুত বিজ্ঞাপনটি রাইয়্যান প্রথম দেখেছিল এমনই এক সন্ধ্যায়; ঠিক সেই সময় যখন ঘরের নিস্তব্ধতা তাকে চারপাশ থেকে চেপে ধরছিল। বিজ্ঞাপনটা পড়ার পর তার মনে হয়েছিল, হয়ত তিন দিনের জন্য পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সে অন্তত নিজের স্মৃতিগুলোর সাথে নিরিবিলিতে সময় কাটানোর একটা সুযোগ হবে। সেখানে কেউ তাকে সান্ত্বনা দেবে না, কেউ বলবে না যে- আহা! পাঁচটা বছর কেটে গেছে, এবার তোমার সামনে তাকানো উচিত।</p>

<p>সিদ্ধান্তটা সে খুব দ্রুতই নিয়েছিল, যেন দীর্ঘদিনের জমানো একটা সিদ্ধান্ত অবশেষে বাস্তব রূপ পেতে চলেছে। যদিও এবারের টেলিপোর্টেশনের টিকিটের দাম ছিলো তার নাগালের বাইরে। তবুও সে সিদ্ধান্ত নিলো সে এটা করবেই। সেই সিদ্ধান্তেই আট মাসের ইউনিট জমা করে যখন টিকিটটি কিনলো তখন তাকে বেশ দীর্ঘ কয়েকটা ফরম পূরণ করতে হয়েছিল। তার নিজের সম্পর্কে বেশ খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে জানাতে হয়েছিল টেলিপোর্টেশন কোম্পানিকে। তার ঠিক দু’দিন পর তার যাত্রার দিন নির্ধারিত হলো।</p>

<p>যাত্রার দিন টার্মিনালে দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছিল, সে কোনো ভ্রমণে যাচ্ছে না, বরং এমন এক সিদ্ধান্তের গভীরে ঢুকে পড়ছে- যার শেষটা সে নিজেও জানে না। টার্মিনালটি ছিল আশ্চর্যরকম নীরব, বিশাল সাদা ঘরের মাঝখানে গোলাকার প্যাডটি ছাড়া আর কিছু নেই, দেয়ালজুড়ে কোনো বিজ্ঞাপন নেই, কোনো কর্মচারী নেই, শুধু মেঝের নিচে নীল আলো ধীরে ধীরে জ্বলছে আর নিভছে।</p>

<p>রাইয়্যান প্যাডের ওপর দাঁড়াতেই একটি যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে এল-
— “আপনি কি নিশ্চিত?”</p>

<p>প্রশ্নটা শুনে সে সামান্য হাসল, জিজ্ঞেস করলো- “কীসের ব্যাপারে?”</p>

<p>কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর এল না, তারপর কণ্ঠটি আবার বলল-‌
— “আপনি কি একাই যেতে চান?”</p>

<p>রাইয়্যানের হাসিটা মিলিয়ে গেল, সে বলল- “হ্যাঁ।”</p>

<p>আলো জ্বলে উঠল, আর পৃথিবী সরে গেল। চোখ খুলে প্রথম যে অনুভূতিটা হলো, সেটা ছিল বাতাসের; বাতাসে লবণের গন্ধ, তার সাথে ভেজা কাঠের একটা মৃদু গন্ধ মিশে আছে। সামনে সমুদ্র, দূরে জলরাশি আকাশের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে মাঝখানে কোনো দিগন্তরেখা নেই, যেন পৃথিবীটা ওই পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। রাইয়্যান টেলিপোর্টেশন প্যাড থেকে নেমে ধীরে ধীরে বালির ওপর হাঁটল, পায়ের নিচে নরম বালি দেবে যাচ্ছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কোনো শব্দ হচ্ছিল না, সে থেমে নিজের পায়ের ছাপের দিকে তাকাল, এরপর পর আবার হাঁটা শুরু করলো।</p>

<p>সামনে একটি ছোট বাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, কাঠের তৈরি, নিচু ছাদ, সামনে বারান্দা। বাড়িটাকে দেখে রাইয়্যানের মনে হলো, সে যেন আগে কোথাও এই বাড়িটা দেখেছে, হয়ত কোনো ছবিতে, হয়ত কোনো স্বপ্নে, নয়তো এমন কোনো কল্পনায় যেটা সে কখনো নিজেকেই ঠিকমতো বলতে পারেনি। ভেতরে ঢুকে সেই অনুভূতিটা আরও তীব্র হলো, সবকিছু অপরিচিত, অথচ খুব অদ্ভুত রকমের পরিচিত। টেবিলের উপর রাখা কফির জারটি ঠিক সেই ব্র্যান্ডের যা সে বাড়িতে ব্যবহার করে; বইয়ের তাকের তৃতীয় সারিতে তার প্রিয় লেখকের সেই বইটি, যেটার শেষ কয়েক পাতা সে কোনোদিন পড়েনি; জানালার পাশে একটি কাঠের চেয়ার, যেটাতে বসে মেঘলা প্রতিদিন বিকেলে চা খেত।</p>

<p>রাইয়্যান প্রথমে এসবকে প্রযুক্তির পরিশীলিত সৌজন্য বলেই ভেবেছিল, বুকিংয়ের আগে কোম্পানি তার জীবনযাত্রা সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেছে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রান্নাঘরের তাকের ওপর রাখা নীল কাপটি দেখে তার সেই ব্যাখ্যাটা আর যথেষ্ট মনে হলো না। নীল রঙের কাপটির কিনারে সূক্ষ্ম একটি ফাটল, হুবহু সেখানেই যেটা মেঘলার কাপেও ছিলো।</p>

<p>এক সকালে কাপটি হাতে নিয়ে মেঘলা বলেছিল, “দেখেছ? এখনও টিকে আছে।” রাইয়্যান তখন বলেছিল, “একদিন ভেঙে যাবে।” মেঘলা হেসে বলেছিল, “ভেঙে গেলেই কি সবকিছু ফেলে দেয়া যায়? যায় না, বুঝলে।” স্মৃতিটা এত হঠাৎ, এত স্পষ্টভাবে ফিরে এল যে রাইয়্যানের মনে হলো, কেউ যেন তার কানের কাছে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলে গেল। সে কাপটির দিকে হাত বাড়িয়েও ছুঁয়ে দেখলো না, কারণ তার মনে হচ্ছিল, একবার ছুঁয়ে দেখলেই হয়ত তাকে মেনে নিতে হবে- এটা মোটেই কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়।</p>

<p>বিকেল নামার পর দ্বীপের রং বদলে গেল, সূর্যের আলো নরম হতে হতে সমুদ্রের বুকের উপর গলিত তামার মতো ছড়িয়ে পড়ল, আকাশে জমল অস্পষ্ট গোলাপি আভা। রাইয়্যান বারান্দায় বসে ছিল, পাশাপাশি দুটি চেয়ার, সে যে চেয়ারে বসেছিল, তার পাশের চেয়ারটি খালি। কিছুক্ষণ পর সে লক্ষ্য করল, খালি চেয়ারটির ওপর একটি ভাঁজ করা কাপড় রাখা, সকালে সেটা সেখানে ছিল না। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল, কাপড়টা ছিল হালকা ধূসর রঙের একটি শাল। সে হাত দিয়ে স্পর্শ করল, পরিচিত কোনো গন্ধ নেই, কোনো নাম নেই, কিছুই নেই যা প্রমাণ করবে এটি মেঘলার। তবু সে খুব যত্ন করে ভাঁজটা ঠিক করে আবার চেয়ারটির উপর রেখে দিল, এমনভাবে, যেন খুব পরিচিত কেউ পরে এসে সেটা গায়ে জড়াবে।</p>

<p>নিজের এই আচরণের উপর নিজেই বিরক্ত হয়ে সে জোরে বলে উঠল, “আমি কী করছি?”</p>

<p>প্রশ্নটা সে জোরে বলেছিল, উত্তর আসেনি। কিন্তু সে লক্ষ্য করল, তার নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে অদ্ভুত লাগছে, যেন বহুদিন ধরে সে কারও সাথে কথা বলেনি।</p>

<p>সন্ধ্যার একটু আগে রাইয়্যান সমুদ্রের ধারে হাঁটতে বের হলো। এবার সে নিজের পায়ের ছাপগুলো লক্ষ্য করছিল, ঢেউ এসে ধীরে ধীরে সেগুলো মুছে দিচ্ছে। সে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা দূরে চলে গেল, হঠাৎ তার চোখে পড়ল বালির ওপর একটি ছোট পাথরের বৃত্ত। কেউ যেন খুব যত্ন করে পাথরগুলো সাজিয়ে রেখেছে। বৃত্তটির মাঝখানে একটি শুকনো শামুকের খোলস, রাইয়্যান সেখানে বসে পড়ল। তার মনে পড়ল, মেঘলা সমুদ্রতীরে শামুক দেখলেই সবসময় একটা শামুকের খোলস কুড়িয়ে নিত, তারপর কিছুক্ষণ হাতের তালুতে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আবার ফেলে দিত। “নেবে না?” রাইয়্যান একবার জিজ্ঞেস করেছিল। “না,” মেঘলা বলেছিল, “ওটার জায়গা ওখানেই।” রাইয়্যানের বুকের ভেতর হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল, সে চারদিকে তাকাল, কেউ নেই, সমুদ্র, আকাশ আর তার নিজের ছায়া, তবু পাথরগুলো কেউ সাজিয়েছে। সে কি সকালে এখানে এসেছিল?! অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না।</p>

<p>সেই রাতে রাইয়্যান ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি, বিছানায় শুয়ে সমুদ্রের শব্দ শুনছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো দিনের বেলায় যে সমুদ্র প্রায় শব্দহীন ছিল, রাত বাড়ার সাথে সাথে তার ঢেউয়ের আওয়াজ যেন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। কখনো মনে হচ্ছিল, জল তীরে এসে ভাঙছে, আবার কখনো মনে হচ্ছিল, কেউ বাড়ির চারপাশে খুব ধীর পায়ে হাঁটছে। কিন্তু রাইয়্যান জানত, সেখানে কেউ নেই, সে নিজেকেই বারবার সেই কথাটা মনে করিয়ে দিল- আমি একাই এসেছি। রাতের কোনো এক সময় তার ঘুম এসে গিয়েছিল, সকালে ঘুম ভাঙার পর সে প্রথমে বুঝতে পারেনি কী তাকে জাগিয়েছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে, ঘর নিস্তব্ধ, তারপর তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর, সেখানে দুটো কাপ রাখা। একটিতে আগের রাতের কফির শুকিয়ে যাওয়া দাগ, অন্যটিতে চা, ধোঁয়া নেই, কিন্তু চায়ের রং এখনও গাঢ়।</p>

<p>রাইয়্যান বিছানা থেকে উঠে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, সে জানত, দ্বিতীয় কাপটি সে রাখেনি। তারপরও তার প্রথম ভাবনায় এলো- ভোর সকাল করে মেঘলাও এমন কড়া চা খেত; পরক্ষণেই সে এই চিন্তাটার জন্য নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করলো। সে বুঝতে পারছিল, তার অবচেতন মন নিজে থেকেই প্রতিটি ঘটনার সাথে মেঘলাকে জুড়ে দিচ্ছে। নীল রঙা মেঘলার কাপ, ভাজ করা মেঘলার শাল, সমুদ্র তীরে মেঘলার হাতে শামুকের খোলস, আর এখনকার এই কড়া চা — সেটাও মেঘলার। হয়ত এসব কিছুই তাকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে, হয়ত কোম্পানির কোনো অ্যালগরিদম তার স্মৃতির দুর্বল জায়গাগুলো জানে। অথবা… -এই শেষ সম্ভাবনাটাই সে ভাবতে চাইলো না।</p>

<p>দুপুরের দিকে রাইয়্যান বাড়ির ভেতরে আরও কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন দেখতে পেল, বইয়ের তাকের ওপর যে বইটি আগের দিন বন্ধ অবস্থায় ছিল, সেটি এখন খোলা, পাতার মাঝখানে একটি শুকনো পাতা রাখা। রাইয়্যান বইটি তুলে নিল, পাতাটি কোথা থেকে এসেছে, সে জানে না, কিন্তু বইয়ের যে পাতায় সেটি রাখা, সেখানে একটি বাক্য দাগ দেওয়া-</p>

<p>“মানুষ কখনো কখনো ফিরে আসে না, তবু তার জন্য জায়গা থেকে যায়।”</p>

<p>রাইয়্যান বইটি বন্ধ করে ফেলল, তার হাত কাঁপছিল না, সে ভয়ও পাচ্ছিল না, বরং তার ভেতরে অন্যরকম একটা অস্থিরতা তৈরি হচ্ছিল। যদি সত্যিই কেউ এখানে থাকে? আর যদি কেউ না থাকে? এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে কোনটা সে বেশি ভয় পায়, রাইয়্যান বুঝতে পারছিল না। কারণ কেউ থাকলে তাকে এমন কিছু বিশ্বাস করতে হবে, যা বিশ্বাস করা সম্ভব নয়, আর কেউ না থাকলে তাকে স্বীকার করতে হবে, সে নিজেই হয়ত এসব ঘটাচ্ছে- কখনো জেগে, কখনো ঘুমের ভেতর এসব সাজিয়ে যাচ্ছে; এবং পরে কিছুই মনে রাখতে পারছে না, যা হয়ত তার চেয়েও ভয়াবহ।</p>

<p>সেদিন বিকেলে সে সিদ্ধান্ত নিল, আর কোনো কিছু নিয়ে অনুমান করবে না, সে রান্নাঘরের টেবিল পরিষ্কার করে দিল, দুটি কাপ ধুয়ে উলটো করে রাখল, চেয়ার দুটো পাশাপাশি ঠেলে দিল, বারান্দায় থাকা শালটি ভাঁজ করে আলমারির ভেতর রেখে দিল। তারপর সে বাড়ির প্রতিটি ঘর ঘুরে দেখল, কোথাও কেউ নেই, সে দরজা বন্ধ করল, জানালা আটকাল, মেঝের ওপর এক টুকরো বালি ছড়িয়ে দিল, যাতে কেউ হাঁটলে পায়ের ছাপ পড়ে। সবশেষে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল, বিকেল ৫টা ৪০। সে সিদ্ধান্ত নিল, সূর্য ডোবার আগে আর কোথাও যাবে না। বারান্দার চেয়ারে বসে থাকবে, কেউ এলে দেখবে, কেউ না এলে অন্তত নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে।</p>

<p>সূর্য ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছিল, সমুদ্রের ওপর আলো ছোট হয়ে আসছিল, আকাশের রং কমলা থেকে গাঢ় বেগুনিতে বদলে যাচ্ছিল, দ্বীপের বাতাসের নোনা স্বাদের সাথে যেন এক ধরনের চাপা প্রতীক্ষার চাপ তৈরি হতে থাকলো। রাইয়্যান চেয়ারে বসে ছিল, চোখ বাড়ির দরজার দিকে। সময় যাচ্ছিল, কেউ আসেনি, বালির উপর কেন পায়ের ছাপ পড়লো না, কোথাও অস্বাভাবিক কোন শব্দও হলো না।</p>

<p>তারপর হঠাৎ সে খেয়াল করল, বারান্দার অন্য চেয়ারটিতে কেউ বসে নেই ঠিকই, কিন্তু চেয়ারটি সামান্য দোল খাচ্ছে, যেন কেউ একটু আগে উঠে গেছে চেয়ারটি থেকে। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল না, সে নিজের শ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল, “বাতাস”, সে মনে মনে বলল, কিন্তু তার মুখে কথা বেরোল না, কারণ বাতাস থেমে ছিল। কিছুক্ষণ পর বাড়ির ভেতর থেকে একটি শব্দ এল, খুব সাধারণ শব্দ, ড্রয়ারের শব্দ, কেউ যেন রান্নাঘরের ড্রয়ার খুলল। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল, তারপর আবার বসে পড়ল, সে বুঝতে পারছিল, তার শরীর বাড়ির ভেতরে যেতে চাইছে না, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, যদি না যায়, তাহলে বাকি সময়টা সে আর এখানে কাটাতে পারবে না। অনেকক্ষণ পরে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, দরজার কাছে গিয়ে থামল, তারপর ভেতরে ঢুকল, রান্নাঘর ফাঁকা, কিন্তু ড্রয়ারটি খোলা, ভেতরে একটি ছোট নোটবুক রাখা।</p>

<p>রাইয়্যান জানে, নোটবুকটি তার নয়। সে সেটি হাতে নিল, প্রথম কয়েকটি পাতা খালি, তারপর একটি পাতায় লেখা দেখতে পেল। লেখাগুলো কাঁপা কাঁপা নয়, তাড়াহুড়ো করেও লেখা নয়, যেন কেউ শান্তভাবে বসে লিখেছে- “আজ সে আবার চেয়ার দুটো পাশাপাশি রেখে দিয়েছে।”</p>

<p>রাইয়্যানের বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে এল, সে পরের লাইনটি পড়ল- “আজও সে বলবে, সে একা। আমি এখনও তাকে বলিনি যে সে গতকাল রাতে সমুদ্রের ধারে অনেকক্ষণ আমার সাথে বসে ছিল।”</p>

<p>রাইয়্যান আর পড়তে পারল না, সে নোটবুক বন্ধ করে দিল, মনে করার চেষ্টা করল গত রাতের কথা, বিছানায় শোয়ার আগে সে কী করেছিল? সে কি সত্যিই বাইরে গিয়েছিল? তার মনে পড়ল না। এক মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে হলো নোটবুকটি ছিঁড়ে সমুদ্রে ফেলে দিতে। তারপর মনে হলো, সেটা করলে হয়ত সে শুধু প্রমাণটাই নষ্ট করবে, প্রশ্নটা নয়। সে নোটবুকটি টেবিলের ওপর রেখে টেলিপোর্টার প্যাডের দিকে হাঁটল, আজ দ্বিতীয় দিন, আরও চব্বিশ ঘণ্টা পর তার ফেরার অনুমতি।</p>

<p>টেলিপোর্টারের স্ক্রিনের সামনে দাঁড়াল, সেখানে লেখা ছিল-
RETURN AVAILABLE IN 23:17:42</p>

<p>তার নিচে আরেকটি লাইন জ্বলছিল-
PASSENGERS READY: 1</p>

<p>রাইয়্যান স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, একজন, সে নিজেই, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর সংখ্যাটা ঝিলমিল করে উঠল, তারপর স্ক্রিনে নতুন করে লেখা এল-
PASSENGERS READY: 2</p>

<p>রাইয়্যান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, সে পেছনে ঘুরে দেখল, দ্বীপে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে, বাড়ির জানালায় আলো জ্বলছে, বারান্দার দুটি চেয়ার পাশাপাশি, দূর থেকে মনে হলো, একটি চেয়ারে কেউ বসে আছে। রাইয়্যান চোখ কুঁচকে তাকাল, পরের মুহূর্তেই সেখানে শুধু শালটা পড়ে থাকতে দেখল- যেটা সে নিজের হাতে আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখেছিল। সে আবার স্ক্রিনের দিকে তাকাল, সংখ্যাটা তখনো দুই। আর ঠিক তখনই পেছন থেকে খুব ধীরে বাড়ির দরজা খোলার একটা মৃদু শব্দ ভেসে এল।</p>

<p>রাইয়্যান চোখ বন্ধ করল, তার মনে হলো, এই মুহূর্তে তার সামনে দুটো পথ আছে। একটি পথ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই শহরে, যেখানে পাঁচ বছর ধরে সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে মেঘলা আর নেই। অন্য পথটি কোথায় নিয়ে যাবে, সে জানে না, শুধু এটুকু জানে- পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে, অথবা দাঁড়িয়ে নেই।</p>

<p>ঠিক তখনই তার হাতের কনসোলটি কেঁপে উঠল, স্ক্রিনে ফেরার সময় হঠাৎ বদলে গেল-
RETURN AVAILABLE NOW</p>

<p>তার নিচে লেখা উঠল- “দয়া করে যাত্রীর সংখ্যা নিশ্চিত করুন।” রাইয়্যান ধীরে ধীরে চোখ খুলল, তার আঙুল দুটি সংখ্যার মাঝখানে স্থির হয়ে রইল- 1 অথবা 2। পেছন থেকে তখন খুব পরিচিত স্বরে কেউ বলল- “রাইয়্যান, এবার কি আমাকে সত্যিই রেখে যাবে?”</p>

<p>রাইয়্যান ঘুরে দাঁড়িয়েছিল কি না, সেটা কোনোদিন জানা যায়নি। পরদিন সকালে তৃতীয় তরঙ্গের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে শুধু একটাই সংকেত পৌঁছেছিল- টেলিপোর্টার প্যাড সক্রিয় হয়েছে, প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, কিন্তু যাত্রীসংখ্যার তথ্য অসম্পূর্ণ।</p>

<p>রাইয়্যানের বুকিং ফাইলের একেবারে শেষ লাইনে, যা পরে কোম্পানির কোনো ইঞ্জিনিয়ার, কোনো অ্যালগরিদম, কোনো তদন্তকারী দল ব্যাখ্যা করতে পারেনি, সেখানে শুধু একটি ছোট্ট নতুন নোট যোগ হয়েছিল লাল অক্ষরে “RETURN NUMBER ERROR!”</p>

<p>সেই দ্বীপে যদি কেউ কোনোদিন আবার যায়, তবে সে হয়ত দেখতে পাবে, বারান্দার দুটো চেয়ার এখনো পাশাপাশি রাখা, একটি চেয়ারের উপর একটি হালকা ধূসর শাল ভাঁজ করা, আর টেবিলের উপর দুটো কাপ। একটি খালি, অন্যটিতে অপেক্ষারত কড়া লিকারের ঠান্ডা চা।</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>
]]></content:encoded>
      <guid>https://infosec.press/lokmanus/ekaakiitber-snggii</guid>
      <pubDate>Fri, 04 Sep 2026 12:54:54 +0000</pubDate>
    </item>
    <item>
      <title>শূন্য সোফার রুম এবং হারানো এক আলোকবর্তিকা</title>
      <link>https://infosec.press/lokmanus/shuuny-sophaar-rum-ebn-haaraano-ek-aalokbrtikaa</link>
      <description>&lt;![CDATA[&#xA;&#xA;জানালার কাচে তখনো বৃষ্টির শেষ ফোঁটাগুলো আলতো করে টোকা দিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও প্রকৃতির বুকে যে উন্মাতাল তাণ্ডব চলল, তাকে একরকম রূপকথা বলেই ভ্রম হয়। দমকা ঝড়ো বাতাস, মেঘের গুরুগুরু গগনবিদারী গর্জন, আর সাথে বুক কাঁপানো দুই-একটি বজ্রপাত -সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন তার সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিল এই আধঘণ্টায়।&#xA;&#xA;তারপর হঠাৎ করেই শান্ত। আকাশ তার রাগ ঝেড়ে এখন হালকা, শান্ত। ঘরের কোণে জমে উঠেছে একটা শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া, যা গায়ে লাগলেই কেমন যেন একটা আলসেমি জড়িয়ে ধরে। মন বলে, এই চমৎকার ঠান্ডা আবহে কম্বলটা গায়ে টেনে দিয়ে একটা লম্বা, নিটোল ঘুম দেওয়া যাক। কিন্তু চোখ বুজলেই কি আর ঘুম আসে? কিছু কিছু আবহাওয়া আসলে ঘুমের চেয়ে বেশি জাগিয়ে তোলে ভেতরের মানুষকে, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে স্মৃতির ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে তাকে তুলে ধরে মনের দৃষ্টিতে।&#xA;&#xA;যেমন আজ এই বৃষ্টির শেষলগ্নে এসে বুকটা কেমন যেন হুঁ হুঁ করে উঠল। খুব মনে পড়ছে আম্মাকে।&#xA;&#xA;!--more--&#xA;&#xA;আসলে ‘ইদানীং মনে পড়ছে’ বলাটা ভুল হবে। আম্মা চলে যাওয়ার পর থেকে জীবনের এমন কোনো মুহূর্ত নেই, যেখানে তার ছায়া আমি খুঁজে না। এখন প্রতিটা ছোটোখাটো কাজেই আম্মা অবধারিতভাবে চলে আসেন। কোনো একটা কাজ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে ভাবি, ‘আচ্ছা, আম্মা থাকলে তো কাজটা এভাবে করতেন না, তিনি হয়তো অন্য কোনো সহজ উপায়ে করে দিতেন!’ কিংবা কোনো জিনিস অগোছালো দেখলে কানের কাছে যেন মায়ের সেই চিরচেনা কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠে, ‘এটা এখানে রাখছিস কেন? ঐখানে রাখ।’ অথবা কোনো কাজে আটকে গেলে মনে হয়, আম্মা থাকলে ঠিকই এই সমস্যার কোনো সমাধান বলে দিতেন। এই রকম হাজারো হাবিজাবি, টুকরো টুকরো ভাবনা এখন আমার একাকিত্বের সঙ্গী।&#xA;&#xA;তবে আজকের এই ঝড়-বৃষ্টির রাতটা যেন আম্মার স্মৃতিকে বড্ড বেশি জীবন্ত করে তুলেছে। আম্মাকে আমাদের চেনা-পরিচিত সবাই খুব সাহসী এক নারী হিসেবেই জানত। যে কোনো বড়ো বিপদ বা কঠিন পরিস্থিতি তিনি এত ঠান্ডা মাথায় সামাল দিতেন যে, অবাক হতে হতো। দেখে মনে হতো, তার কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। যেন এক অদ্ভুত জাদুবলে সবটা ঠিক হয়ে যাচ্ছে, কিংবা অদৃশ্য কেউ একজন এসে তার হয়ে সব গুছিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।&#xA;&#xA;কিন্তু আমার কেন যেন মনে হতো, এই পাহাড়সম সাহসী মানুষটারও একটা দুর্বল জায়গা ছিল। ঝড়-বৃষ্টির সময় আম্মাকে আমার বড্ড ভীতু মনে হতো। যদিও তিনি মুখে কখনো ভয়ের কথা স্বীকার করতেন না, চোখে-মুখেও ভয়ের কোনো রেখা ফুটতে দিতেন না, তাও একজন সন্তানের চোখ তো! মায়ের ভেতরের চাপা অস্থিরতাটুকু আমি ঠিকই টের পেতাম।&#xA;&#xA;সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে আজও ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফোটে, আবার পরক্ষণেই চোখটা ভিজে আসে। বজ্রপাত শুরু হওয়া মাত্রই নিয়ম করে এলাকার বিদ্যুৎ চলে যেত। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার হওয়ার আগেই আম্মা তড়িঘড়ি করে এসে বসতেন আমাদের ড্রয়িংরুমে, যেটাকে আমরা বলতাম ‘সোফার রুম’। সোফার রুমে বসেই উচ্চকণ্ঠে বাড়ির সবাইকে ডাকতেন, ‘কই রে তোরা, সব এখানে আয়!’&#xA;&#xA;আম্মার ডাক শোনামাত্রই আমরা যে যেখানে থাকতাম সবাই মিলে টর্চ, চার্জার লাইট কিংবা মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে সেই সোফার রুমে গিয়ে জড়ো হতাম। মুহূর্তের মধ্যেই সেই অন্ধকার ঘরটা আলো আর মানুষের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠতো। এরপর শুরু হতো এক তুমুল আড্ডা। বাচ্চারা আলো-আধারেই নিজেদের মতো খেলা শুরু করে দিতো, চিৎকার করত, ঝগড়া করতো আবার খুনসুটিতে মেতে উঠত।&#xA;&#xA;আম্মা কখনো কখনো সোফায় কিংবা মেঝেতে বসতেন। বাকিরা যে যার সুবিধা মতো জায়গা করে বসতো। তারপর আম্মা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করতেন। কত গল্প বলতেন, কত মানুষকে নিয়ে বলতেন, কত-কত সময়কে নিয়ে বলতেন। কী ছিলো না তার সেই টুকরো টুকরো কথায়! আমি সাধারণত সেসব আড্ডায় খুব একটা কথা বলতাম না, নিজের মতো এক কোণে বসে আম্মার গল্প শুনতাম, বাচ্চাদের আনন্দ দেখতাম, মোবাইল স্ক্রিনে দৃষ্টি নিবন্ধ করে রাখতাম, আর মাঝে মাঝে চোখ তুলে আম্মাকে একটু দেখতাম। অন্ধকারের মাঝেও আম্মার হাসিমুখটা দেখতে বড্ড ভালো লাগত।&#xA;&#xA;আম্মা শুধু আমাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন এমন না, বরং ঝড়ের মাঝেই মোবাইলে কাছের-দূরের আত্মীয়, পরিচিত সব মানুষকে ফোন করে খোঁজ-খবর নিতেন। কে কেমন আছে, কার বাড়ির চাল উড়ে গেল কি না, কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলো কি না -এমন সব খোঁজ-খবর নেয়া চলতো। পুরো ঘরটা তখন এক অদ্ভুত ওমে, ভালোবাসার চাদরে ঢাকা পড়ে থাকত। বাইরের ঝড়-বৃষ্টির হুংকার তখন আর আমাদের ছুঁতে পারত না।&#xA;&#xA;আজ আম্মা নেই, দেখতে দেখতে একটা বছর পার হয়ে গেল। প্রকৃতিতে আজও ঝড় আসে, বৃষ্টি নামে, আকাশ ভেঙে বজ্রপাত হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে চারদিক আগের মতোই অন্ধকার হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের আর সেই সোফার রুমে একত্রে বসা হয় না। সত্যি বলতে, এখন আর ওভাবে বসতে ইচ্ছেও করে না। যে মানুষটাকে কেন্দ্র করে আমাদের সেই অন্ধকারের উৎসব জমে উঠত, সেই মানুষটাই যখন নেই, তখন সোফার রুমের ওই শূন্যতাটুকু বড্ড বেশি কামড়ে ধরে। সবার হৃদয়ে আলো জ্বালানোর মানুষটাই আজ অন্ধকার ঘরে একাকী নিদ্রা যাপন করছে।&#xA;&#xA;মাঝে মাঝে এই রকম দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির রাতে বুকের ভেতরটা বড্ড বেশি হাহাকার করে ওঠে। তীব্র ইচ্ছে জাগে, সব ফেলে এই ঝড়-বৃষ্টির মাঝেই ছুটে যাই আম্মার কবরের পাশে। সেখানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকি, যেভাবে একসময় সোফার রুমে এক কোণে বসতাম। আম্মার মাটির বিছানার পাশে বসে বলি, ‘আম্মা, ডরাইয়েন না। এই বৃষ্টি একটু পরেই থাইমা যাইবো।’&#xA;&#xA;কিন্তু সময় আর নিষ্ঠুর বাস্তবতার বেড়াজালে আটকে সেই ইচ্ছেটা আর পূরণ হয় না। জানালা দিয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসটা গায়ে লাগে, আর আমি একা ঘরের বিছানায় শুয়ে স্মৃতির কম্বল মুড়ি দিয়ে আম্মাকে খুঁজি।&#xA;&#xA;আম্মা ভালো থাকুক তার এই দীর্ঘ নিদ্রায়। পৃথিবীর কোনো ঝড়, কোনো মেঘের গর্জন কিংবা কোনো বজ্রপাত আর কখনোই যেন তাকে বিচলিত না করতে পারে। অনন্তকাল পরম শান্তিতে তিনি ঘুমিয়ে থাকুক নিশ্চিন্তে।&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀]]&gt;</description>
      <content:encoded><![CDATA[<p><img src="https://i.postimg.cc/prKXZHw5/PI-img-2026-05-26.jpg" alt=""></p>

<p>জানালার কাচে তখনো বৃষ্টির শেষ ফোঁটাগুলো আলতো করে টোকা দিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও প্রকৃতির বুকে যে উন্মাতাল তাণ্ডব চলল, তাকে একরকম রূপকথা বলেই ভ্রম হয়। দমকা ঝড়ো বাতাস, মেঘের গুরুগুরু গগনবিদারী গর্জন, আর সাথে বুক কাঁপানো দুই-একটি বজ্রপাত -সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন তার সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিল এই আধঘণ্টায়।</p>

<p>তারপর হঠাৎ করেই শান্ত। আকাশ তার রাগ ঝেড়ে এখন হালকা, শান্ত। ঘরের কোণে জমে উঠেছে একটা শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া, যা গায়ে লাগলেই কেমন যেন একটা আলসেমি জড়িয়ে ধরে। মন বলে, এই চমৎকার ঠান্ডা আবহে কম্বলটা গায়ে টেনে দিয়ে একটা লম্বা, নিটোল ঘুম দেওয়া যাক। কিন্তু চোখ বুজলেই কি আর ঘুম আসে? কিছু কিছু আবহাওয়া আসলে ঘুমের চেয়ে বেশি জাগিয়ে তোলে ভেতরের মানুষকে, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে স্মৃতির ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে তাকে তুলে ধরে মনের দৃষ্টিতে।</p>

<p>যেমন আজ এই বৃষ্টির শেষলগ্নে এসে বুকটা কেমন যেন হুঁ হুঁ করে উঠল। খুব মনে পড়ছে আম্মাকে।</p>



<p>আসলে ‘ইদানীং মনে পড়ছে’ বলাটা ভুল হবে। আম্মা চলে যাওয়ার পর থেকে জীবনের এমন কোনো মুহূর্ত নেই, যেখানে তার ছায়া আমি খুঁজে না। এখন প্রতিটা ছোটোখাটো কাজেই আম্মা অবধারিতভাবে চলে আসেন। কোনো একটা কাজ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে ভাবি, ‘আচ্ছা, আম্মা থাকলে তো কাজটা এভাবে করতেন না, তিনি হয়তো অন্য কোনো সহজ উপায়ে করে দিতেন!’ কিংবা কোনো জিনিস অগোছালো দেখলে কানের কাছে যেন মায়ের সেই চিরচেনা কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠে, ‘এটা এখানে রাখছিস কেন? ঐখানে রাখ।’ অথবা কোনো কাজে আটকে গেলে মনে হয়, আম্মা থাকলে ঠিকই এই সমস্যার কোনো সমাধান বলে দিতেন। এই রকম হাজারো হাবিজাবি, টুকরো টুকরো ভাবনা এখন আমার একাকিত্বের সঙ্গী।</p>

<p>তবে আজকের এই ঝড়-বৃষ্টির রাতটা যেন আম্মার স্মৃতিকে বড্ড বেশি জীবন্ত করে তুলেছে। আম্মাকে আমাদের চেনা-পরিচিত সবাই খুব সাহসী এক নারী হিসেবেই জানত। যে কোনো বড়ো বিপদ বা কঠিন পরিস্থিতি তিনি এত ঠান্ডা মাথায় সামাল দিতেন যে, অবাক হতে হতো। দেখে মনে হতো, তার কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। যেন এক অদ্ভুত জাদুবলে সবটা ঠিক হয়ে যাচ্ছে, কিংবা অদৃশ্য কেউ একজন এসে তার হয়ে সব গুছিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।</p>

<p>কিন্তু আমার কেন যেন মনে হতো, এই পাহাড়সম সাহসী মানুষটারও একটা দুর্বল জায়গা ছিল। ঝড়-বৃষ্টির সময় আম্মাকে আমার বড্ড ভীতু মনে হতো। যদিও তিনি মুখে কখনো ভয়ের কথা স্বীকার করতেন না, চোখে-মুখেও ভয়ের কোনো রেখা ফুটতে দিতেন না, তাও একজন সন্তানের চোখ তো! মায়ের ভেতরের চাপা অস্থিরতাটুকু আমি ঠিকই টের পেতাম।</p>

<p>সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে আজও ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফোটে, আবার পরক্ষণেই চোখটা ভিজে আসে। বজ্রপাত শুরু হওয়া মাত্রই নিয়ম করে এলাকার বিদ্যুৎ চলে যেত। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার হওয়ার আগেই আম্মা তড়িঘড়ি করে এসে বসতেন আমাদের ড্রয়িংরুমে, যেটাকে আমরা বলতাম ‘সোফার রুম’। সোফার রুমে বসেই উচ্চকণ্ঠে বাড়ির সবাইকে ডাকতেন, ‘কই রে তোরা, সব এখানে আয়!’</p>

<p>আম্মার ডাক শোনামাত্রই আমরা যে যেখানে থাকতাম সবাই মিলে টর্চ, চার্জার লাইট কিংবা মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে সেই সোফার রুমে গিয়ে জড়ো হতাম। মুহূর্তের মধ্যেই সেই অন্ধকার ঘরটা আলো আর মানুষের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠতো। এরপর শুরু হতো এক তুমুল আড্ডা। বাচ্চারা আলো-আধারেই নিজেদের মতো খেলা শুরু করে দিতো, চিৎকার করত, ঝগড়া করতো আবার খুনসুটিতে মেতে উঠত।</p>

<p>আম্মা কখনো কখনো সোফায় কিংবা মেঝেতে বসতেন। বাকিরা যে যার সুবিধা মতো জায়গা করে বসতো। তারপর আম্মা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করতেন। কত গল্প বলতেন, কত মানুষকে নিয়ে বলতেন, কত-কত সময়কে নিয়ে বলতেন। কী ছিলো না তার সেই টুকরো টুকরো কথায়! আমি সাধারণত সেসব আড্ডায় খুব একটা কথা বলতাম না, নিজের মতো এক কোণে বসে আম্মার গল্প শুনতাম, বাচ্চাদের আনন্দ দেখতাম, মোবাইল স্ক্রিনে দৃষ্টি নিবন্ধ করে রাখতাম, আর মাঝে মাঝে চোখ তুলে আম্মাকে একটু দেখতাম। অন্ধকারের মাঝেও আম্মার হাসিমুখটা দেখতে বড্ড ভালো লাগত।</p>

<p>আম্মা শুধু আমাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন এমন না, বরং ঝড়ের মাঝেই মোবাইলে কাছের-দূরের আত্মীয়, পরিচিত সব মানুষকে ফোন করে খোঁজ-খবর নিতেন। কে কেমন আছে, কার বাড়ির চাল উড়ে গেল কি না, কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলো কি না -এমন সব খোঁজ-খবর নেয়া চলতো। পুরো ঘরটা তখন এক অদ্ভুত ওমে, ভালোবাসার চাদরে ঢাকা পড়ে থাকত। বাইরের ঝড়-বৃষ্টির হুংকার তখন আর আমাদের ছুঁতে পারত না।</p>

<p>আজ আম্মা নেই, দেখতে দেখতে একটা বছর পার হয়ে গেল। প্রকৃতিতে আজও ঝড় আসে, বৃষ্টি নামে, আকাশ ভেঙে বজ্রপাত হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে চারদিক আগের মতোই অন্ধকার হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের আর সেই সোফার রুমে একত্রে বসা হয় না। সত্যি বলতে, এখন আর ওভাবে বসতে ইচ্ছেও করে না। যে মানুষটাকে কেন্দ্র করে আমাদের সেই অন্ধকারের উৎসব জমে উঠত, সেই মানুষটাই যখন নেই, তখন সোফার রুমের ওই শূন্যতাটুকু বড্ড বেশি কামড়ে ধরে। সবার হৃদয়ে আলো জ্বালানোর মানুষটাই আজ অন্ধকার ঘরে একাকী নিদ্রা যাপন করছে।</p>

<p>মাঝে মাঝে এই রকম দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির রাতে বুকের ভেতরটা বড্ড বেশি হাহাকার করে ওঠে। তীব্র ইচ্ছে জাগে, সব ফেলে এই ঝড়-বৃষ্টির মাঝেই ছুটে যাই আম্মার কবরের পাশে। সেখানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকি, যেভাবে একসময় সোফার রুমে এক কোণে বসতাম। আম্মার মাটির বিছানার পাশে বসে বলি, ‘আম্মা, ডরাইয়েন না। এই বৃষ্টি একটু পরেই থাইমা যাইবো।’</p>

<p>কিন্তু সময় আর নিষ্ঠুর বাস্তবতার বেড়াজালে আটকে সেই ইচ্ছেটা আর পূরণ হয় না। জানালা দিয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসটা গায়ে লাগে, আর আমি একা ঘরের বিছানায় শুয়ে স্মৃতির কম্বল মুড়ি দিয়ে আম্মাকে খুঁজি।</p>

<p>আম্মা ভালো থাকুক তার এই দীর্ঘ নিদ্রায়। পৃথিবীর কোনো ঝড়, কোনো মেঘের গর্জন কিংবা কোনো বজ্রপাত আর কখনোই যেন তাকে বিচলিত না করতে পারে। অনন্তকাল পরম শান্তিতে তিনি ঘুমিয়ে থাকুক নিশ্চিন্তে।</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>
]]></content:encoded>
      <guid>https://infosec.press/lokmanus/shuuny-sophaar-rum-ebn-haaraano-ek-aalokbrtikaa</guid>
      <pubDate>Mon, 25 May 2026 18:00:00 +0000</pubDate>
    </item>
    <item>
      <title>আমরা আসলে কিছুই বুঝি না...</title>
      <link>https://infosec.press/lokmanus/aamraa-aasle-kichui-bujhi-naa</link>
      <description>&lt;![CDATA[&#xA;&#xA;লাভ বুঝি না লোকসান বুঝি না&#xA;ভালো বুঝি না মন্দ বুঝি না&#xA;কিংবা তাদের মিসেল বুঝি না&#xA;হাসি বুঝি না কান্না বুঝি না&#xA;কাছের মানুষ হারাবার আগে&#xA;তাদের চোখের ভাষাটা বুঝি না&#xA;আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা&#xA;&#xA;গ্রাম ভেঙে শহর করার আগে&#xA;গ্রাম্য জীবনের সরলতা বুঝি না&#xA;নদী ভরাট জমি করার আগে&#xA;নিরালা বাতাসের শীতলতা বুঝি না&#xA;মাটির ঘর পাঁকা করার আগে&#xA;আপন নিবাসের ঠিকানা বুঝি না&#xA;আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা&#xA;&#xA;!--more--&#xA;&#xA;ধুলো মাখা পথে পিচ ঢালার আগে&#xA;খালি পায়ে হাঁটার সুখটা বুঝি না&#xA;ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বালাবার আগে&#xA;আঁধারে বসার শান্তি বুঝি না&#xA;জোনাকি দল হারাবার আগে&#xA;অন্ধকারের ভাষাটা বুঝি না&#xA;আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা&#xA;&#xA;উজ্জ্বল এলইডিতে হারাবার আগে&#xA;কুপির বাতির নাচন বুঝি না&#xA;স্ক্রিনের আড্ডায় হারাবার আগে&#xA;উঠোনে গল্পের আসর বুঝি না&#xA;গোছানো ফ্ল্যাটে হারাবার আগে&#xA;মুক্তপ্রাঙ্গণের বিস্তার বুঝি না&#xA;আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা&#xA;&#xA;হাঁসে ভরা বিল হারানোর আগে&#xA;মন জুড়ানো বিকাল বুঝি না&#xA;ধান ক্ষেতের দোল হারানোর আগে&#xA;সবুজের মোহ মাত্রা বুঝি না&#xA;বরই-পেয়ারা গাছ হারানোর আগে&#xA;লংকা-লবণের স্বাদ বুঝি না&#xA;আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা&#xA;&#xA;ডাঙ্গুলির শৈশব হারানোর আগে&#xA;মায়ের বকুনির মমতা বুঝি না&#xA;কৈশোরের দুরন্ত হারানোর আগে&#xA;নিস্বার্থের বন্ধুর মায়াটা বুঝি না&#xA;সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি হারানোর আগে&#xA;মুক্তো আকাশের বিশালতা বুঝি না&#xA;আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা&#xA;&#xA;যান্ত্রিক চাকায় শান্তি হারাবার আগে&#xA;ধীর জীবনের ছন্দ বুঝি না&#xA;নগর বিনিদ্রায় হারাবার আগে&#xA;নিশি গ্রামের নিদ বুঝি না&#xA;শ্রুতিকটু অ্যালার্মে ভোর হারাবার আগে&#xA;পাখির ডাকে ঘুম ভাঙা বুঝি না&#xA;আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা&#xA;&#xA;শহুরে ভিড়ে হারাবার আগে&#xA;চেনা মুখের মায়া বুঝি না&#xA;জেব্রাক্রসিং এ হারাবার আগে&#xA;আঁকা বাঁকা পথের জাদু বুঝি না&#xA;শহুরে জঞ্জালে হারাবার আগে&#xA;সরল গ্রামের বিপুলতা বুঝি না&#xA;আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা…&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀&#xA;&#xA;⠀⠀]]&gt;</description>
      <content:encoded><![CDATA[<p><img src="https://i.ibb.co/jvngjFN6/PI-amra-asole-kichui-bujhi-na.jpg" alt=""></p>

<p>লাভ বুঝি না লোকসান বুঝি না
ভালো বুঝি না মন্দ বুঝি না
কিংবা তাদের মিসেল বুঝি না
হাসি বুঝি না কান্না বুঝি না
কাছের মানুষ হারাবার আগে
তাদের চোখের ভাষাটা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা</p>

<p>গ্রাম ভেঙে শহর করার আগে
গ্রাম্য জীবনের সরলতা বুঝি না
নদী ভরাট জমি করার আগে
নিরালা বাতাসের শীতলতা বুঝি না
মাটির ঘর পাঁকা করার আগে
আপন নিবাসের ঠিকানা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা</p>



<p>ধুলো মাখা পথে পিচ ঢালার আগে
খালি পায়ে হাঁটার সুখটা বুঝি না
ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বালাবার আগে
আঁধারে বসার শান্তি বুঝি না
জোনাকি দল হারাবার আগে
অন্ধকারের ভাষাটা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা</p>

<p>উজ্জ্বল এলইডিতে হারাবার আগে
কুপির বাতির নাচন বুঝি না
স্ক্রিনের আড্ডায় হারাবার আগে
উঠোনে গল্পের আসর বুঝি না
গোছানো ফ্ল্যাটে হারাবার আগে
মুক্তপ্রাঙ্গণের বিস্তার বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা</p>

<p>হাঁসে ভরা বিল হারানোর আগে
মন জুড়ানো বিকাল বুঝি না
ধান ক্ষেতের দোল হারানোর আগে
সবুজের মোহ মাত্রা বুঝি না
বরই-পেয়ারা গাছ হারানোর আগে
লংকা-লবণের স্বাদ বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা</p>

<p>ডাঙ্গুলির শৈশব হারানোর আগে
মায়ের বকুনির মমতা বুঝি না
কৈশোরের দুরন্ত হারানোর আগে
নিস্বার্থের বন্ধুর মায়াটা বুঝি না
সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি হারানোর আগে
মুক্তো আকাশের বিশালতা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা</p>

<p>যান্ত্রিক চাকায় শান্তি হারাবার আগে
ধীর জীবনের ছন্দ বুঝি না
নগর বিনিদ্রায় হারাবার আগে
নিশি গ্রামের নিদ বুঝি না
শ্রুতিকটু অ্যালার্মে ভোর হারাবার আগে
পাখির ডাকে ঘুম ভাঙা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা</p>

<p>শহুরে ভিড়ে হারাবার আগে
চেনা মুখের মায়া বুঝি না
জেব্রাক্রসিং এ হারাবার আগে
আঁকা বাঁকা পথের জাদু বুঝি না
শহুরে জঞ্জালে হারাবার আগে
সরল গ্রামের বিপুলতা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা…</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>

<p>⠀⠀</p>
]]></content:encoded>
      <guid>https://infosec.press/lokmanus/aamraa-aasle-kichui-bujhi-naa</guid>
      <pubDate>Fri, 24 Apr 2026 15:45:41 +0000</pubDate>
    </item>
    <item>
      <title>অন্ধকারের দর্শন</title>
      <link>https://infosec.press/lokmanus/andhkaarer-drshn</link>
      <description>&lt;![CDATA[&#xA;⠀⠀&#xA;বহুকাল আমি নিজেকে একজন ভুল মানুষ ভেবে এসেছি। আমার পৃথিবীটা ছিল কুয়াশায় ঢাকা, যেখানে স্পষ্ট বলতে কিছুই ছিল না। আমার ভেতরে নিজেকে প্রকাশ করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল, কিন্তু যতবারই আমি মুখ খুলতে চেয়েছি, ততবারই মনে হয়েছে যেন কেউ একজন আমার কথাগুলো বন্দি করতে ছুটে আসছে। ভয় ছিল আমার ছায়াসঙ্গী। তাই আলো থেকে পালিয়ে বারবার আমি ফিরে এসেছি আমার পরিচিত অন্ধকারে, আর সেই অন্ধকারই হয়ে উঠেছিল আমার একমাত্র পরিচয়। আমি মেনেই নিয়েছিলাম- আমি আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত ভুলে ভরা এক মানুষ, যার জন্মই হয়েছে ভুল করার জন্য। &#xA;&#xA;কিন্তু একদিন সবকিছু বদলে গেল, যেদিন আমার ভাবনার সাগর নিজের গতিপথ বদলে গিয়ে পড়ল ছোট্ট একটি বীজের উপর। &#xA;!--more--&#xA;মাটির গভীরে, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে একটি বীজ পড়ে থাকে। তাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, “কেন তুমি এই অন্ধকারে? বাইরে এসো, আলোর পৃথিবী তোমাকে ডাকছে,” সে হয়তো কোনো উত্তরই দেবে না। কারণ সে জানে, ঐ অন্ধকার তার শত্রু নয়, বরং তার আশ্রয়। ঐ মাটি, ঐ চাপ, আর ঐ একাকিত্ব.. এগুলো ছাড়া তার শেকড় গজাবেই না। আলোতে মাথা তোলার আগে, ঐ অন্ধকারকে তার আপন করে নিতে হয়, মাটির প্রতিটি কণার সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে হয়। &#xA;&#xA;সেই বিকেলে আমার হঠাৎ মনে হলো, আমি তো সেই বীজটার মতোই। আমার ভয়, আমার অস্পষ্টতা, আমার ভুলগুলো… ওগুলো আসলে আমার শত্রু ছিল না, ওগুলোই ছিল আমার মাটি। যতবার আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি, ততবার আমি আসলে নিজের শেকড়কে আরও গভীরে চালনা করেছি। &#xA;&#xA;এই ভাবনাটা আমাকে পৃথিবীর দিকে নতুন করে তাকাতে শেখালো। আমি দেখলাম, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতো শিল্পীও তাঁর সেরা কাজগুলো অসম্পূর্ণ রেখে গেছেন, কিন্তু তাতে তাঁর মহত্ত্ব কমেনি। আমি বুঝলাম, পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অমাবস্যার রাতের প্রয়োজন বেশি, কারণ সেই অন্ধকারই আমাদের আকাশের আসল রূপ চেনায়, কোটি কোটি তারার জগৎ চোখের সামনে মেলে ধরে। প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো এই যেমন আমাদের চিরচেনা ক্ষণস্থায়ী সূর্যাস্ত বা পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনা -কোনোটিই চিরস্থায়ী বা নিখুঁত নয়, কিন্তু তাদের সৌন্দর্য অসীম। &#xA;&#xA;আর ঠিক তখনই, আমার নিজের পরিচয়টা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি “অন্ধকারের মানুষ” নই। আমি সেই মানুষ, যে অন্ধকারকে চেনে। যে অন্ধকারের অতল গভীরতাকে ভয় পায় না, বরং তাকে আলিঙ্গন করে নিতে শিখেছে। আমার ভুলগুলো আমার ব্যর্থতার ইতিহাস নয়, বরং আমার পথচলার চিহ্ন। আমার ভেতরের দ্বিধাগুলো আমার দুর্বলতা নয়, সেগুলো আমার চিন্তাশীল মনের প্রমাণ। &#xA;&#xA;সেদিন আমি বুঝতে পারলাম, আমি ভুলে ভরা এক মানুষ নই, বরং আমি অভিজ্ঞতায় ভরা এক জীবন্ত সত্তা।&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;এখন আর আমি আলো খোঁজার জন্য দৌড়াই না। ভয় এলে তাকে তাড়িয়ে দিই না, বরং তার কথা শুনি। ভুল করলে নিজেকে দোষারোপ করি না, বরং হাসি মুখে ভাবি, “বেশ, এখান থেকে নতুন কী শিখলাম?” আমার সেই অন্ধকার ঘরটা এখন আর ভয়ের জায়গা নয়, ওটা আমার শক্তির উৎস -আমার শেকড়ের মাটি। &#xA;&#xA;আলোর দিকে দৌড়ানোর প্রয়োজনটাই হয়তো ফুরিয়ে গেছে। কারণ যখন একজন মানুষ নিজের অন্ধকারকে আপন করে নিতে পারে, তখন সে নিজেই নিজের আলো হয়ে ওঠে।&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀&#xA;⠀⠀]]&gt;</description>
      <content:encoded><![CDATA[<p><img src="https://i.postimg.cc/59QHyckG/PI-2026-04-11c.jpg" alt="">
⠀⠀
বহুকাল আমি নিজেকে একজন ভুল মানুষ ভেবে এসেছি। আমার পৃথিবীটা ছিল কুয়াশায় ঢাকা, যেখানে স্পষ্ট বলতে কিছুই ছিল না। আমার ভেতরে নিজেকে প্রকাশ করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল, কিন্তু যতবারই আমি মুখ খুলতে চেয়েছি, ততবারই মনে হয়েছে যেন কেউ একজন আমার কথাগুলো বন্দি করতে ছুটে আসছে। ভয় ছিল আমার ছায়াসঙ্গী। তাই আলো থেকে পালিয়ে বারবার আমি ফিরে এসেছি আমার পরিচিত অন্ধকারে, আর সেই অন্ধকারই হয়ে উঠেছিল আমার একমাত্র পরিচয়। আমি মেনেই নিয়েছিলাম- আমি আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত ভুলে ভরা এক মানুষ, যার জন্মই হয়েছে ভুল করার জন্য।</p>

<p>কিন্তু একদিন সবকিছু বদলে গেল, যেদিন আমার ভাবনার সাগর নিজের গতিপথ বদলে গিয়ে পড়ল ছোট্ট একটি বীজের উপর।

মাটির গভীরে, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে একটি বীজ পড়ে থাকে। তাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, “কেন তুমি এই অন্ধকারে? বাইরে এসো, আলোর পৃথিবী তোমাকে ডাকছে,” সে হয়তো কোনো উত্তরই দেবে না। কারণ সে জানে, ঐ অন্ধকার তার শত্রু নয়, বরং তার আশ্রয়। ঐ মাটি, ঐ চাপ, আর ঐ একাকিত্ব.. এগুলো ছাড়া তার শেকড় গজাবেই না। আলোতে মাথা তোলার আগে, ঐ অন্ধকারকে তার আপন করে নিতে হয়, মাটির প্রতিটি কণার সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে হয়।</p>

<p>সেই বিকেলে আমার হঠাৎ মনে হলো, আমি তো সেই বীজটার মতোই। আমার ভয়, আমার অস্পষ্টতা, আমার ভুলগুলো… ওগুলো আসলে আমার শত্রু ছিল না, ওগুলোই ছিল আমার মাটি। যতবার আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি, ততবার আমি আসলে নিজের শেকড়কে আরও গভীরে চালনা করেছি।</p>

<p>এই ভাবনাটা আমাকে পৃথিবীর দিকে নতুন করে তাকাতে শেখালো। আমি দেখলাম, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতো শিল্পীও তাঁর সেরা কাজগুলো অসম্পূর্ণ রেখে গেছেন, কিন্তু তাতে তাঁর মহত্ত্ব কমেনি। আমি বুঝলাম, পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অমাবস্যার রাতের প্রয়োজন বেশি, কারণ সেই অন্ধকারই আমাদের আকাশের আসল রূপ চেনায়, কোটি কোটি তারার জগৎ চোখের সামনে মেলে ধরে। প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো এই যেমন আমাদের চিরচেনা ক্ষণস্থায়ী সূর্যাস্ত বা পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনা -কোনোটিই চিরস্থায়ী বা নিখুঁত নয়, কিন্তু তাদের সৌন্দর্য অসীম।</p>

<p>আর ঠিক তখনই, আমার নিজের পরিচয়টা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি “অন্ধকারের মানুষ” নই। আমি সেই মানুষ, যে অন্ধকারকে চেনে। যে অন্ধকারের অতল গভীরতাকে ভয় পায় না, বরং তাকে আলিঙ্গন করে নিতে শিখেছে। আমার ভুলগুলো আমার ব্যর্থতার ইতিহাস নয়, বরং আমার পথচলার চিহ্ন। আমার ভেতরের দ্বিধাগুলো আমার দুর্বলতা নয়, সেগুলো আমার চিন্তাশীল মনের প্রমাণ।</p>

<p>সেদিন আমি বুঝতে পারলাম, আমি ভুলে ভরা এক মানুষ নই, বরং আমি অভিজ্ঞতায় ভরা এক জীবন্ত সত্তা।
⠀⠀
⠀⠀
এখন আর আমি আলো খোঁজার জন্য দৌড়াই না। ভয় এলে তাকে তাড়িয়ে দিই না, বরং তার কথা শুনি। ভুল করলে নিজেকে দোষারোপ করি না, বরং হাসি মুখে ভাবি, “বেশ, এখান থেকে নতুন কী শিখলাম?” আমার সেই অন্ধকার ঘরটা এখন আর ভয়ের জায়গা নয়, ওটা আমার শক্তির উৎস -আমার শেকড়ের মাটি।</p>

<p>আলোর দিকে দৌড়ানোর প্রয়োজনটাই হয়তো ফুরিয়ে গেছে। কারণ যখন একজন মানুষ নিজের অন্ধকারকে আপন করে নিতে পারে, তখন সে নিজেই নিজের আলো হয়ে ওঠে।
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀</p>
]]></content:encoded>
      <guid>https://infosec.press/lokmanus/andhkaarer-drshn</guid>
      <pubDate>Sat, 11 Apr 2026 11:25:21 +0000</pubDate>
    </item>
    <item>
      <title>রাজকীয় ছাগল উৎপাদনে আমাদের অবদান</title>
      <link>https://infosec.press/lokmanus/raajkiiy-chaagl-u-paadne-aamaader-abdaan</link>
      <description>&lt;![CDATA[ &#xA;&#xA;মানুষ ঠিক ততটুকুই সম্মানেই সবচেয়ে মানবিক থাকে, যতটুকু তার প্রাপ্য। এর বেশি দিলেই বিপদ। এটি কোনো দার্শনিক অনুমান নয়, এটি জীবনের ঘটনাপ্রবাহকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া একটি অকাট্য সত্য। &#xA;&#xA;অতিরিক্ত সম্মান মানুষের মস্তিষ্কে এক বিচিত্র রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। প্রথমে সে এই অযাচিত সম্মান পেয়ে একটু অবাক হয়, তারপর তাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে, এবং তারপর- এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ধাপ; সে ধরেই নেয় যে এটাই তার ন্যায্য প্রাপ্য ছিল!! &#xA;&#xA;!--more--&#xA;&#xA;এই উপলব্ধির পর থেকে সে হঠাৎ আবিষ্কার করে যে তার মতামত অমোঘ, তার রুচি অতুলনীয়, এবং পৃথিবীর বাকি সবাই মূলত তার জ্ঞানের অপেক্ষায় ক্ষুদ্র, তুচ্ছ, অতিনগণ্য। এরপর থেকে সে আর মানুষের মতো আচরণ করে না; সে আচরণ করে একজন রাজকীয় ছাগলের মতো। যেদিকে খুশি যায়, যা খুশি বলে, যা খুশি করে, যা খুশি তাতে মুখ লাগায়, যা খুশি তাই খায়, আর কেউ সামান্য বাধা দিলে উলটো শিং নাড়িয়ে তেড়ে আসে। &#xA;&#xA;এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো, এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?&#xA;&#xA;একটাই উপায় তার, তা হলো &#39;সম্মান প্রত্যাহার&#39;।&#xA;কিন্তু সেটি ধীরে ধীরে করলে কাজ হয় না, কারণ মানুষ নিজের সম্মান হারানোর ব্যাপারে অত্যন্ত সৃজনশীল(!)। প্রতিটি ধাপে সে নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। সে ভাবে এবং বলে- &#34;ওরা আসলে আমাকে বোঝে না&#34;, &#34;ওরা হিংসুটে, আমাকে হিংসা করে&#34;, &#34;ওরা আমার কদর বুঝলো না&#34;, &#34;আমি যে ওদের জন্য কী করেছি তা ওরা বুঝলো না&#34;, কিংবা &#34;এই যুগ/লোকগুলো আমার উপযুক্ত নয়&#34;। এমনকি প্রয়োজনে সে ইতিহাসের দুই-একজন মহামানবের সাথে নিজের তুলনাও টেনে বসে, কারণ তারাও নাকি জীবদ্দশায় স্বীকৃতি পাননি। এই জাতীয় দার্শনিক সান্ত্বনা সে নিজেই নিজেকে অবিরাম দিতে থাকে, এবং ছাগলামি নির্বিঘ্নে অব্যাহত রাখে। &#xA;&#xA;সম্মান পুরোপুরি শূন্য না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া থামে না। শূন্যের কোঠায় এসে সে কিছুটা থমকায়, চারদিকে তাকায়, এবং ধীরে ধীরে আবার মানুষ হওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তখন অবশ্য অনেক দেরি হয়ে যায়, এবং দর্শকরাও ততদিনে তাকে ছেড়ে চলে গিয়ে থাকে। &#xA;&#xA;তাই কাউকে সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা করলে, তাকে যতটুকু প্রাপ্য ঠিক ততটুকুই সম্মান দিন, তার বিন্দু বেশি নয়। &#xA;&#xA;কারণ অতিরিক্ত সম্মান আসলে সম্মান নয়, এটি একটি ধীরগতির বিষ, একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিশাপ। এই অভিশাপ মানুষকে নিজের অজান্তেই, ধীরে ধীরে, অত্যন্ত নিপুণভাবে অন্য একটি প্রাণীতে রূপান্তরিত করে।&#xA;এবং সেই প্রাণীটির নাম ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।&#xA;&#xA;~ বাস্তবতার ঘটনাপ্রবাহ ছেঁকে সংগৃহীত]]&gt;</description>
      <content:encoded><![CDATA[<p><img src="https://i.ibb.co/LdX1GXhk/PI-202603152335.jpg" alt=" "></p>

<p>মানুষ ঠিক ততটুকুই সম্মানেই সবচেয়ে মানবিক থাকে, যতটুকু তার প্রাপ্য। এর বেশি দিলেই বিপদ। এটি কোনো দার্শনিক অনুমান নয়, এটি জীবনের ঘটনাপ্রবাহকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া একটি অকাট্য সত্য।</p>

<p>অতিরিক্ত সম্মান মানুষের মস্তিষ্কে এক বিচিত্র রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। প্রথমে সে এই অযাচিত সম্মান পেয়ে একটু অবাক হয়, তারপর তাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে, এবং তারপর- এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ধাপ; সে ধরেই নেয় যে এটাই তার ন্যায্য প্রাপ্য ছিল!!</p>



<p>এই উপলব্ধির পর থেকে সে হঠাৎ আবিষ্কার করে যে তার মতামত অমোঘ, তার রুচি অতুলনীয়, এবং পৃথিবীর বাকি সবাই মূলত তার জ্ঞানের অপেক্ষায় ক্ষুদ্র, তুচ্ছ, অতিনগণ্য। এরপর থেকে সে আর মানুষের মতো আচরণ করে না; সে আচরণ করে একজন রাজকীয় ছাগলের মতো। যেদিকে খুশি যায়, যা খুশি বলে, যা খুশি করে, যা খুশি তাতে মুখ লাগায়, যা খুশি তাই খায়, আর কেউ সামান্য বাধা দিলে উলটো শিং নাড়িয়ে তেড়ে আসে।</p>

<p>এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো, এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?</p>

<p>একটাই উপায় তার, তা হলো &#39;সম্মান প্রত্যাহার&#39;।
কিন্তু সেটি ধীরে ধীরে করলে কাজ হয় না, কারণ মানুষ নিজের সম্মান হারানোর ব্যাপারে অত্যন্ত সৃজনশীল(!)। প্রতিটি ধাপে সে নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। সে ভাবে এবং বলে- “ওরা আসলে আমাকে বোঝে না”, “ওরা হিংসুটে, আমাকে হিংসা করে”, “ওরা আমার কদর বুঝলো না”, “আমি যে ওদের জন্য কী করেছি তা ওরা বুঝলো না”, কিংবা “এই যুগ/লোকগুলো আমার উপযুক্ত নয়”। এমনকি প্রয়োজনে সে ইতিহাসের দুই-একজন মহামানবের সাথে নিজের তুলনাও টেনে বসে, কারণ তারাও নাকি জীবদ্দশায় স্বীকৃতি পাননি। এই জাতীয় দার্শনিক সান্ত্বনা সে নিজেই নিজেকে অবিরাম দিতে থাকে, এবং ছাগলামি নির্বিঘ্নে অব্যাহত রাখে।</p>

<p>সম্মান পুরোপুরি শূন্য না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া থামে না। শূন্যের কোঠায় এসে সে কিছুটা থমকায়, চারদিকে তাকায়, এবং ধীরে ধীরে আবার মানুষ হওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তখন অবশ্য অনেক দেরি হয়ে যায়, এবং দর্শকরাও ততদিনে তাকে ছেড়ে চলে গিয়ে থাকে।</p>

<p>তাই কাউকে সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা করলে, তাকে যতটুকু প্রাপ্য ঠিক ততটুকুই সম্মান দিন, তার বিন্দু বেশি নয়।</p>

<p>কারণ অতিরিক্ত সম্মান আসলে সম্মান নয়, এটি একটি ধীরগতির বিষ, একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিশাপ। এই অভিশাপ মানুষকে নিজের অজান্তেই, ধীরে ধীরে, অত্যন্ত নিপুণভাবে অন্য একটি প্রাণীতে রূপান্তরিত করে।
এবং সেই প্রাণীটির নাম ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।</p>

<p>~ বাস্তবতার ঘটনাপ্রবাহ ছেঁকে সংগৃহীত</p>
]]></content:encoded>
      <guid>https://infosec.press/lokmanus/raajkiiy-chaagl-u-paadne-aamaader-abdaan</guid>
      <pubDate>Sun, 15 Mar 2026 18:00:00 +0000</pubDate>
    </item>
  </channel>
</rss>